Latest

উত্তরাখন্ড বিপর্যয় আমাদের ভোগবাদী চিন্তার সামান্যতম ফসল

Author: 
ড. অরুণকান্তি বিশ্বাস
Source: 
বিদ্যালয় পত্রিকা, মে - 2016

বেহিসেবি, ভোগবাদী যান্ত্রিকভাবে সভ্য সমাজ এই শতাব্দীর শেষে নিয়ে এল জল, বায়ু, মৃত্তিকা এবং শব্দ, দৃশ্য দূষণের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূষণের প্রকটতা ও সভ্যতার দৈন।

বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে মানবজীবন এখন এক কঠিন ও অভাবনীয় সত্যের মুখোমুখি। পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপন্ন মানুষের অস্তিত্বে। ধন - সম্পদ ও প্রাচুর্যের প্রয়োজনে প্রয়ুক্তি - বিজ্ঞানকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে আসা হয়েছে। প্রাকৃতিকে নিঃস্ব করে, তার প্রাণসম্পদকে হরণ করে, দৈনন্দিন ব্যবহারিক বস্তুবাহুল্যে পরিণত করার আয়োজনে, জীব প্রাণশক্তিই হয়েছে বিপন্ন। পৃথিবীর বায়ু, মাটি, জল সঠিকভাবে সংরক্ষিত না হলে ভবিষ্যতে প্রাণের পরিবেশে যে ভীষণ সংকট নেমে আসবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিপর্যস্ত মানবজীবন ও জৈব প্রকৃতি ধ্বংসের অন্যতম কারণ পরিবেশ দূষণ, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়েছে বহুদিন আগেই। শুধুই উন্নতির জন্য উন্নতির মত্ততা ও বিশ্বের বিত্তবান শ্রেণীর একপেশে ভোগবাদী জীবনযাত্রা এবং বস্তু-কোলাহলপূর্ণ সংস্কতির বিশ্বায়ন, প্রাণ ও প্রাণী সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করে এসেছে, যা থেকে জন্ম নিয়েছে জীবনের বিপক্ষে নিয়ত যুদ্ধের ইতিহাস। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম অংশে, বৃহত্তম সম্পদ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে। বৈষম্যের চেহারাটা ক্রমশই যত প্রকট রূপ নিয়েছে, পরিবেশের সংকট তত ঘনীভূত হয়েছে, আড়ালে পড়ে গেছে মানুষ ও প্রাণী জীবনের ভবিষ্যত। অথচ ভোগবাদী সংস্কৃতির মূল্য দিতে, বঞ্চিত মানুষেরাই পেয়েছে পরিবেশ দূষণের মতন এক ভয়াবহ অবস্থাকে।

বেহিসেবি, ভোগবাদী যান্ত্রিকভাবে সভ্য সমাজ এই শতাব্দীর শেষে নিয়ে এল জল, বায়ু, মৃত্তিকা এবং শব্দ, দৃশ্য দূষণের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূষণের প্রকটতা ও সভ্যতার দৈন। মাটির প্রাণ সম্পদকে হরণ করে অরণ্যকে প্রায় নিশ্চিত করে, সামুদ্রিক জৈব প্রাণ শক্তিকে প্রায় বিনষ্টের মুখে এনে ভবিষ্যত শতাব্দীর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজ - সংস্কৃতি এখন যন্ত্র সভ্যতা ও মানব সভ্যতার সম্বন্ধকে একেবারে নতুন সমালোচনার মাত্রায় দেখতে বাধ্য হয়েছে। প্রযুক্তি সভ্যতার ইতিহাসেও এত বড়ো সংকট আগে বোধহয় আর আসেনি। পৃথিবীতে প্রাণী প্রজাতির যে মহাজগত গড়ে উঠেছে তার মধ্যে মানুষ একটি প্রজাতি মাত্র। বিবর্তনের থেকেই সে প্রকৃতির সম্পদ ব্যবহার করে আসছে। প্রায় সাড়ে ছ’-শ কোটি মানুষ পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর মাত্র চার দশক পরে অর্থাত 2050 সালে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় এক হাজার কোটিতে।

গঙ্গা দিয়ে বহমান জলের পরিমান মোটামুটি হিসেবে 525 কিলো কিউবিক মিটার ( 525Km3 ), গঙ্গার উত্সস্থল গঙ্গোত্রী হিমবাহ-তুষার স্রোত, যা গোমুখ (বা গরুরু মুখ) নামে বিখ্যাত, 30 কিমি দীর্ঘ। গোমুখ প্রতিবছরে 15 - 20 মিটার অপসৃত হচ্ছে, পাঁচটি উপনদী - ভাগীরথী, মন্দাকিনী, অলকানন্দা, দোওলিঙ্গাগা ও পিন্দার জল স্রোতের সমন্বয়ে দেবপ্রয়াগের কাছে গঙ্গা নামে পরিচিত। গোমুখ থেকে গঙ্গোত্রী পর্যন্ত অংশটিকে দরুণ অপসরণ বা অপসৃত হয়ে যাচ্ছে। 1790 সাল থেকেই অপসৃতির শুরু এবং এখন আরো দ্রুততায় হচ্ছে ( নাসার স্যাটলাইট চিত্র অনুসরণে ) তীর্থ যাত্রীরা বদ্রীনাথের পবিত্র স্থানে যাওয়ার সময় অলকানন্দার সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে পৌঁছে যায়।

জন বিস্ফারণ ও শস্যের চাহিদার কারণে আরো বহু অঞ্চলে চাষবাস শুরু হয়। শস্যের বৈচিত্র অনুযায়ী জলের পরিমান পরিবর্তিত হতে থাকে ( গম চাষে 420 মিমি জল লাগে, আমন ধানে লাগে 1050 মিমি, আঁখ চাষে 2500 মিমি জল লাগে ) ফলত পুরোনো পদ্ধতির বদলে জল সেচনে বড় বড় কংক্রীটের কাঠামো তৈরী করে জলকে আটকে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে শুরু হল, বিভিন্ন উপত্যকায় বাঁধ নির্মাণ করে জল অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা তৈরী হল।

16 জুন 2013-এ যে প্রাকৃতিক বির্পযয় হল তা অকল্পনীয়। মৃত্যু সংখ্যার কোন সঠিক হিসেব নেই, প্রায় দশ হাজারের ওপর। ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আহত। গবাদি পশুর কথা হিসেবে নেই। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চা গ্রাম যে নিশ্চিহ্ন হয়েছে তা বলার নয়। অনেক ধন সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। ভেসে গিয়েছে অনেক রাস্তাঘাট। উত্তরাঞ্চলে অনেক জলবিদ্যুত কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। নদীর ভয়ংকর স্রোতে সব ভেঙ্গেচুরে খড়ের টুকরোর মতো ভেসে গেছে। মানুষের মৃত দেহে যত্রতত্র পড়ে আছে।

প্রকৃতি যেন প্রতিশোধ নিচ্ছে। যদিও এই বিপর্যয়ের সঠিক কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি, অনুসন্ধান চলছে। কারণ যে পরিমান বৃষ্টিপাত হয়েছিল তাতে এই ধরণের প্লাবন হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে ওই অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র, এত তীর্থযাত্রী, এত যানবাহন, শিল্পায়নের এতটা ধকল প্রকৃতি সহ্য করতে পারেনি। ফলত ঘটে যায় এই ভয়ংকর দুর্যোগ। আর, এই আমরা তো পরিবেশ নিয়ে ততটা ভাবনা করি না। আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর এক অহংকারী প্রজাতি হয়ে এক লোভী ও ভোগবাদী সমাজ রচনায় আমরা ব্যস্ত।

আসুন আমরা নিজেদের পাল্টাই।

सम्पर्क


ড. অরুণকান্তি বিশ্বাস
প্রাক্তন পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা ও ডেপুটি ডাইরেক্টর, ন্যাশানাল এনভায়রনমেণ্টাল ইঞ্জিনীয়ারিং রির্সাচ অনস্টিটিউট (নিরী), কলকাতা


Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

CAPTCHA
यह सवाल इस परीक्षण के लिए है कि क्या आप एक इंसान हैं या मशीनी स्वचालित स्पैम प्रस्तुतियाँ डालने वाली चीज
इस सरल गणितीय समस्या का समाधान करें. जैसे- उदाहरण 1+ 3= 4 और अपना पोस्ट करें
3 + 13 =
Solve this simple math problem and enter the result. E.g. for 1+3, enter 4.