Latest

আকালের সন্ধানে

Author: 
প্রীতম দাশগুপ্ত
Source: 
গোপালপুর কলম সোসাইটি পরিচালিত পাক্ষিক সংবাদপত্র ‘দুর্বার কলম’, ‘জল’ উত্সব সংখ্যা 2016

‘কালে মেঘা, কালে মেঘা পানি তো বরসাও। বিজুরি কী তলবার নেহি বুন্দ কী বান চালাও’।

জলের আকাল। এক ফোঁটা জলের জন্য যুদ্ধ। ভারতের সবথেকে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রের কিছু জেলায় ট্যাঙ্ক পাহারা দিতে হচ্ছে পুলিশকে। কিন্তু শুধু মহারাষ্ট্র নয় এই মুহূর্তে খরা ঘোষিত 10টি রাজ্যে প্রভাবিত আরও তিনটি রাজ্য। শীর্ষ আদালত এই নিয়ে গাফিলতির জন্য তীব্র ভত্সনা করেছে কেন্দ্রকে প্রকৃত চিত্রটি ঠিক কী ? স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন খরা কবলিত হয় এত রাজ্যে ?

2016 সাল, সবে মে মাসের শুরু। আবহাওয়া দপ্তরের ধারণা এবার দেশে বর্ষা বেশি হবে। তবে সেই বর্ষা ঢুকতে ঢুকতে জুন মাস হয়ে যাবে। কিন্তু এরই মধ্যে খরা আক্রান্তের সংখ্যা 33 কোটি ছাড়িয়েছে। তার মানে দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষই এখন খরা কবলিত, 10 টি রাজ্য খরা প্রভাবিত। ঘোষিত না হলেও আরও তিনটি রাজ্যের পরিস্থিতি, খরা পরিস্থিতি। তবে বৃষ্টি হলেই যে খরা থেকে সুরাহা মিলবে এমনটা কিন্তু আশা করা কঠিন।

ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের মোট উত্পাদনে কৃষির ভূমিকা কম হলেও প্রায় 70 শতাংশ মানুষই কিন্তু কৃষির উপর নির্ভরশীল। জলের অভাবে সেই কৃষিই এখন সংকটের মুখে। পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো হয়ে উঠেছে যে শ্রমের অভিবাসন দেখা যাচ্ছে সমস্ত দেশজুড়ে। খরা কবলিত এলাকার কৃষকরা দলে দলে এলাকা ছাড়ছেন, বা বলা ভাল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষক এখন মজুরের কাজ বেছে নিচ্ছেন, নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি কেমন? লাতুরের কথাই বলা যাক। মানুষ খাওয়ার বা রান্নার জল পাচ্ছেনই না। বেশ কতকগুলি কৃষিভিত্তিক শিল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শ্রমিকরা রাজ্য ছাড়ছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে একমাত্র জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া লাতুরের দুটি বড় হাসপাতালে অস্ত্রপচার বন্ধ রেখেছেন।

সরকারি তথ্যেই বলা হয়েছে, এখন দেশের চার ভাগের এক ভাগ মানুষ খরা কবলিত। অন্তত 10 টি রাজ্যের 313 টি জেলার দেড় লক্ষেরও বেশি গ্রামে খরার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরা কবলিত গ্রাম রয়েছে মধ্যপ্রদেশে। সংখ্যাটি 42 হাজার 429। এর পরের স্থান হল ওড়িশার। তারপর অর্থাত তৃতীয় স্থানে রয়েছে কর্ণাটক। ওড়িশার তিতালগড়ে গত 24 এপ্রিল তাপমাত্রা উঠেছিল 48 ডিগ্রী সেলসিয়াস। শুধু তিতালগড়ই নয়, ওড়িশার বেশ কতগুলি জায়গায় তাপমাত্রা 46 ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ছিল। এবারে বিভিন্ন এলাকার তাপমাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে জলাধারগুলির জলও শুকিয়ে গিয়েছে। দেশের 91টি প্রধান জলাধারের জল নিয়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় জল কমিশন যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে মাত্র 29 শতাংশ জল রয়েছে। অ্যাসোচেমের সাম্প্রতিক রির্পোটে বলা হয়েছে, খরার ফলে দেশের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে 6 লক্ষ 50 হাজার কোটি টাকা। জলাধারগুলিতে জল কমে যাওয়ায় ব্যহত হচ্ছে বিদ্যুত উত্পাদন।

এখন সবাই চাতক পাখির মতো বৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর বলেছে এবার বৃষ্টি ভালো হবে। আর বর্ষা দেশে ঢুকবে সময় মেনেই। ফলে বৃষ্টি হলেই খরা পরিস্থিতি কাটবে বলে আশাবাদী সকলেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্ষা হলেই সমস্যা মিটবে এমন ধারণা কিন্তু ঠিক নয়। কারণ চলতি বছরে দেশের একটা অংশে তাপমাত্রা অনেকদিন ধরেই 40 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল। যা স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত পাঁচ ডিগ্রি বেশি। এর উপর গত দুই বছর দেশে ভালো বর্ষা না হওয়ায় মাটির নীচের জল স্তরের দফা রফা হয়ে গিয়েছে। তাই বর্ষা ভাল হলেও, পরিস্থিতির উন্নতির কোন সম্ভাবনা এখনই নেই বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। তবে এরই মধ্যে একটাই আশার আলো রয়েছে। এল নিনোর প্রভাব এখন কমে গিয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার এল নিনোর বিপরীত প্রতিক্রিয়া শুরু হবে। সেই কারণেই ভারতে এবার বর্ষা ভালো হবে। এই প্রক্রিয়া আবার বেশ কয়েক বছর চলবে। ফলে চলতি বছরে না হলেও, আগামী কয়েক বছর যদি বর্ষা ভালো হয়, আর সরকার যদি জল ধরে রাখার ব্যাপারে সত্যিই উদ্যোগী হতে পারে, তবে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা যেতে পারে। কিন্তু এর জন্য দরকার সদিচ্ছা, শুধু ভাষণ নয়। প্রতি বিন্দুতে অধিক ফসলের স্লোগান তখনই কার্যকর হবে যখন সরকার কার্যকরীভাবে জল সংরক্ষণের নীতি রূপায়ণ করবে।

খরা পরিস্থিতি নিয়ে সরগরম হয়েছে সংসদও। প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার রাজ্যসভায় বলেন, এই মুহূর্তে দেশের 11টি রাজ্য খরা কবলিত। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এর মোকাবিলা করতে হবে। যেটা অবিলম্বে করতে হবে সেটা হল ত্রাণের বণ্টন করা। প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমাদের বার বার খরার মতো সমস্যায় কেন পড়তে হচ্ছে? খরা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। একই সঙ্গে বাকি থাকা দেশের 321টি সেচ প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। সম্প্রতি লোকসভাতেও খরা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সদস্যরা। তৃণমূলের অপরূপা পোদ্দার এক যোগে খরা মোকাবিলার কথা বলেন। সি পি এম -এর মহম্মদ সেলিম বলেন, যুদ্ধকালীন তত্পরতায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে হবে। বিজেপির প্রীতম মুন্ডে খরা নিয়ে রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠার কথা বলেন। গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী বীরেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, খরা কবলিত রাজ্যগুলিতে ত্রাণের অর্থ বণ্টনে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু আলোচনায় অংশ নিয়ে দলাদলির উর্ধ্বে ওঠেন নি তিনি। বলেন, ইউ. পি. এ. আমলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প নিয়ে মানুষের আস্থা ছিল না। এন. ডি. এ. আমলে আস্থা ফিরে এসেছে।

খরা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভত্সনা ও কোপের মুখে পড়তে হয়েছে কেন্দ্র ও কয়েকটি রাজ্যকে। দেশের শীর্ষ আদালত কেন্দ্রকে একটি বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিল গড়তে দিয়েছে। খরা আক্রান্তরা যাতে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়, তাও দেখতে বলেছে সর্বোচ্চ আদালত। খরা ঘোষণার দায় রাজ্যের হলেও কেন্দ্র যে দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না তাও স্পষ্টই বুঝিয়েছে সুপ্রিম র্কোটে বিচারপতিদের রায়। পর্যবেক্ষণে রাজ্যগুলি উট পাখির মতো আচরণ করলেও, কেন্দ্র চুপ থাকতে পারে না। পাশাপাশি খরার বিষয়ে রাজ্যগুলিকে আগাম সতর্ক করে দেওয়ার দায়িত্বও কেন্দ্রের রয়েছে বলে জানিয়ে দিয়েছে আদালত। 10 বছর পার হলেও, খরা নিয়ে যে প্রকৃত কোনও নীতি তৈরি না হওয়ায় খেদ প্রকাশ করেছেন বিচারপতিরা। কিন্তু এতো নতুন নয়। সরকারের হুঁশ আর ফিরবে কবে?

খরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবারই মহারাষ্ট্র ওয়াটার ট্যাঙ্কার পাঠিয়েছে রেল। কিন্তু সেই ওয়াটার ট্যাঙ্কারের জল আর কতটুকু চাহিদা মেটাতে পারে? ফলে বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে জল নিয়ে দাঙ্গা। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছে ত্রাণ তহবিল চেয়েছেন। কেন্দ্রের তরফে জানানোও হয়েছে অর্থ নিয়ে সমস্যা নেই। এমনকী হ্যান্ড পাম্প, কুয়োর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু সরকার যাই বলুক, খরা প্রভাবিতরাই বুঝতে পারছেন, তাঁদের হাল কতটা বেহাল।

জলের আকাল। এক ফোঁটা জলের জন্য যুদ্ধ। ভারতের সব থেকে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রের কিছু জেলায় ট্যাঙ্ক পাহারা দিতে হচ্ছে পুলিশকে। কিন্তু শুধু মহারাষ্ট্র নয় এই মুহূর্তে খরা ঘোষিত হয়েছে 10 টি রাজ্যে। প্রভাবিত আরও তিনটি রাজ্য। শীর্ষ আদালত এই নিয়ে গাফিলতির জন্য তীব্র ভত্সনা করেছে কেন্দ্রকে প্রকৃত চিত্রটি ঠিক কী? স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন খরা কবলিত হয় এত রাজ্য?

খরা কবলিত দেশের এক চতুর্থাংশ সুপ্রিম কোর্টে তীব্র ভত্সনা সরকারের হূঁশ ফিরবে কবে? পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো যে শ্রমের অভিবাসন দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে। খরা কবলিত এলাকার কৃষকরা দলে দলে এলাকা ছাড়ছেন। কৃষক এখন মজুরের কাজ বেছে নিচ্ছেন। (25 মে 2016 বর্তমান)

Source: Published at Gopalpur, Sarkarpool, South 24 Parganas, Pin-700143.

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options

CAPTCHA
यह सवाल इस परीक्षण के लिए है कि क्या आप एक इंसान हैं या मशीनी स्वचालित स्पैम प्रस्तुतियाँ डालने वाली चीज
इस सरल गणितीय समस्या का समाधान करें. जैसे- उदाहरण 1+ 3= 4 और अपना पोस्ट करें
5 + 13 =
Solve this simple math problem and enter the result. E.g. for 1+3, enter 4.