ভূমিকম্পের এক বছর পর – স্মৃতি ও ভবিষ্যত চিন্তা

Submitted by Hindi on Sun, 09/03/2017 - 10:06
Printer Friendly, PDF & Email
Source
“VIGYAN – O - VIGYANKARMI” A bi - monthly magazine, July - August 1990, B2 Baisakhi, 153 / 1 Jessore Road, Kolkata – 700 114

এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য তা হলো বহু দশকের প্রচেষ্টার ইতিহাস যা সানফ্রানসিসকো তথা গোটা কালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্প - জনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নূন্যতম রাখার সাহায্য করেছে এবং বর্তমান অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে আরও বেশী কার্যকরীভাবে সাহায্য করবে। সারা আমেরিকা কালিফোর্নিয়ার এই প্রচেষ্টা সফল করবে। আজ সারা আমেরিকা কালিফোর্নিয়ার এই প্রচেষ্টা এবং সাফল্য থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। আশা করা যায় গোটা পৃথিবী একদিন এই শিক্ষা নিতে সমর্থ হবে।

17 -ই অক্টোবর 1989 বিকাল 5 টা। 6 -তলা বাড়ীর 4 -তলার ল্যাবরেটরীতে গবেষণার কাজকর্ম তখনও জোরকদমে চলছে। আমার পাশের বেঞ্চের কর্মীটি কাজের সাথে ট্রানজিস্টারে সানফ্রানসিসকোর কেনডেলষ্টিক পার্কে আয়োজিত বেসবল টুর্নামেণ্টের খেলার প্রাকধারাবিবরণী শুনে যাচ্ছে। খেলা তখনও শুরু হয়নি। কয়েক মিনিট পর আমি খানিকটা বেঁকে নীচু হয়ে একটি যন্ত্রের কাজ নিয়ন্ত্রন করতে যাচ্ছিলাম। হঠাত এক ঝাঁকুনিতে হুমড়ি খেয়ে যন্ত্রের গায়ে গিয়ে পড়লাম। সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই টের পেলাম যে সারা বাড়ীটাই দোলনার মতো দুলছে। ছুটে গিয়ে একটা টেবিলের নীচে ঢুকলাম। এভাবে চললো প্রায় 10 সেকেন্ড। এতো দুলুনী সত্বেও কিন্তু ঐ 6 তলা বাড়ীর ভিতরে বা বাইরে কোন ক্ষয় ক্ষতি হলো না। এর কারণ আমরা পরে আলোচনা করছি। ইতিমধ্যে ধারা-বিবরণী বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এবার জরুরী ঘোষণা করে জানানো হলো যে সানফ্রানসিসকো থেকে 100 মাইল দক্ষিণে সান্তাক্রুজ পাহাড়ে অবস্থিত লোমা - প্রিয়েটকে কেন্দ্র করে একটি ভূমিকম্প (রক্টার স্কেলে 7.1) হয়ে গেছে।

কিছু বিহ্বল মুহূর্ত্ত কেটে যাওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেয়ে চারিদিকের পরিস্থিতি ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। এখানকার রেডিও ও টেলিভিসনের প্রায় প্রত্যেক চ্যানেলের একটি নিয়মিত কাজ হলো সকাল - বিকাল হেলিকপ্টারে চড়ে সার্ভে করা এবং স্যাটেলাইটের সাহায্যে আবহাওয়া ও ট্রাফিক পরিস্থিতি জানানো। ওরাই প্রথম ভয়াবহ খবরটা জানালো যে ওকল্যান্ড শহরের উপর দিয়ে এবং সানফ্রানসিসকো - উপসাগরের ওপর দিয়ে যে দুটি দোতলা হাইওয়ে ব্রীজের মতো চলে গেছে, তার উপর তলাটির কিছু অংশ ভেঙ্গে পড়েছে এবং অনেক গাড়ী যাত্রীসহ মাঝখানে আটকে পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। পরে আরও জানা গেল যে মেরিনা শহরের একাংশ গ্যাস লাইন ফেটে আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে । ক্ষয় ক্ষতি ও দুর্ঘটনার সমস্ত বিবরণ একের পর এক ধীরে ধীরে আসতে লাগল।

ডলারের হিসাবে দেখলে ক্ষতির পরিমান 7 - 10 বিলিয়ন ডলার। প্রাথমিক হিসাবে মৃতের সংখ্যা 300 মনে হলেও ক্রমশঃ ধীরে ধীরে সে হিসাব কমে কমে 62তে এসে দাঁড়ালো। তাছাড়া 35000 জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং প্রায় 12000 লোকের সাময়িকভাবে গৃহহীন হওয়ার খবর আসে। (এদের অনেকেই ভূমিকম্প বীমার দৌলতে পরে গৃহ ফিরে পাবেন)। এই খবর এবং এইসব হিসাব মর্মান্তিক হলেও বিশেষজ্ঞদের মনে কিছু আশা - ভরসা ও উদ্দীপনা অনুভব করার সুযোগ রেখেছে। কিসের আশা - ভরসা ? সেটাই এই রিপোর্টে আমাদের বক্তব্য।

এই প্রসঙ্গে সোভিয়েট রাশিয়ার আর্মেনিয়া রিপাবলিকে 1988 সালের 7ই ডিসেম্বর যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় তার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই ভূমি-কম্পের ( 6.8 – 7 0 রিক্টার ভূকম্পন হয় প্রায় 20 সেকেন্ড ধরে ) সাথে লোমা - প্রিয়েটার ভূমিকল্পের ( 7.1 রিক্টার ভূমিকল্প হয় প্রায় 10 সেকেন্ড ধরে ) বেশ কিছুটা তুলনা চলে, যদিও আর্মেনিয়ার ঐ ভুকম্পন প্রায় 10 সেকেন্ড বেশীক্ষণ ধরে চলে। ক্ষতির দিক থেকে অবশ্য এই দুটো ভূকম্পনের কোন তুলনা চলে না। আর্মেনিয়ার 25000 -এর বেশী লোক মারা যান এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দাঁড়ায় প্রায় 15 বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া প্রায় লক্ষাধিক পরিবার আহত হন ও গৃহহীনও হন প্রায় লক্ষাধিক পরিবার। সেই তুলনায় সানফ্রানসিসকো - উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রানহানির সংখ্যা নগণ্যই বলা যায়। অবশ্য তার মূল কারণ হল বড় বড় অট্টালিকা বাড়ী ঘর ঙেঙ্গে পড়ার ঘটনা তুলনায় ঘটেছে অনেক কম, যদিও বিজ্ঞানীরা এখন হিসাব করে দেখেছেন যে যদি ভূকম্পন আরও 10 সেকেন্ড বেশী হতো তাহলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশী হতো। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য তা হলো বহু দশকের প্রচেষ্টার ইতিহাস যা সানফ্রানসিসকো তথা গোটা কালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্প - জনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নূন্যতম রাখার সাহায্য করেছে এবং বর্তমান অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে আরও বেশী কার্যকরীভাবে সাহায্য করবে। সারা আমেরিকা কালিফোর্নিয়ার এই প্রচেষ্টা সফল করবে। আজ সারা আমেরিকা কালিফোর্নিয়ার এই প্রচেষ্টা এবং সাফল্য থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। আশা করা যায় গোটা পৃথিবী একদিন এই শিক্ষা নিতে সমর্থ হবে।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যখন আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলি গণযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, প্রায় সেই সময় দেশ -বিদেশের স্বর্ণ - সন্ধানীরা পশ্চিমে কালিফোর্নিয়ায় এসে চষে বেড়াতে থাকে (এই প্রসঙ্গে চার্লি চ্যাপলিয়নের গোল্ড রাশ চলচিত্রের কথা স্মরণ করা যেতে পারে ) এবং সেক্রামেণ্টাতে স্বর্ণখনির গোড়াপত্তন করে। এই সব বিদেশীদের (অধিকাংশই স্প্যানীশ, পর্ত্তুগীজ ও অন্যান্য ইউ –রোপীয়ান ) একাংশ সানফ্রানসিসকোয় এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে ও ব্যবসা বাণিজ্য চালু করে। ক্রমশঃ ধীরে ধীরে এমন এক নগরী গড়ে ওঠে যা প্রশান্ত ও আটলাণ্টিক মহাসাগরের চারপাশের ভাগ্যাম্বেষীদের লক্ষ্য স্থল হয়ে ওঠে।

কিন্তু 1906 সালের ভূমিকম্পে সানফ্রানসিসকোর সেই অগ্রগতিরস্রোত সাময়িকভাবে গতিরুদ্ধ হয়। সেই ভূকম্পনে (8.25 রিক্টর ) ঘর – বাড়ি - অট্টালিকা ভেঙ্গে পড়ার চেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় গ্যাস লাইন ফেটে আগুন লেগে যাওয়া। সেই আগুনে প্রায় সমস্ত শহর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যদিও সেই আগুনে অবশ্য মাত্র 700 লোক মারা যায়, সম্পত্তির ক্ষয় ক্ষতি হয় বর্তমান মূল্যে 20 বিলিয়ন ডলার ( তখনকার হিসেবে 0.5 বিলিয়ন ডলার )। ঐ ভূকম্পন কালিফোর্নিয়াবাসীদের এমনভাবে নাড়া দেয় যে শুধুমাত্র সানফ্রানসিসকোকে পুনরায় গড়ে তোলা নয়, সারা কালিফোর্নিয়াকে এই রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে কি করে রক্ষা করা যায় সেই সব চিন্তা ও পরিকল্পনা দানা বাঁধতে থাকে। এখানে বলাবাহুল্য যে, সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনধারা ও সাবেকী চিন্তাধারার মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন চেতনা আনা খুব একটা সহজ কাজ নয় বরং বলা যায় এ এক কঠিন কাজ। বিশেষ করে সময়ের সাথে যখন দুর্ভোগের স্মৃতি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে এবং মানুষ তখন আবার তার ব্যক্তিগত সুখ -সুবিধার গন্ডির মধ্যে ফিরে যায়।

কিন্তু বিজ্ঞানী, স্থপতি ও বিশেষজ্ঞদের তো ইতিহাস মাথায় রেখে এগোতে হয়, তাদের ইতিহাস ভোলা চলে না। তাদের কাঁধেই সমস্ত দায়িত্ব বর্তে যায়। শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর গবেষণা, শুরু হয় তথ্য - সংগ্রহের কাজ, যে কাজ আজও চলেছে সমান ভাবে, তুমুল ভাবে। স্বার্থাম্বেষীদের বাধা সব সময়ই থাকবে। তবে স্বার্থাম্বেষীদের শত বাধা সত্বেও সেইসব সংগৃহীত তথ্য রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত হতে বাধ্য করে। ফলে নগর পরিকল্পনার কাজে তথ্যভিত্তিক নতুন আইন চালু ও প্রয়োগ করা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করার প্রয়াস অব্যাহত থাকে। যে দুটো ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে এই সব তথ্য সংগ্রহের কাজ চলেছে এরকম গবেষণা লব্ধ ফলাফল প্রয়োগ করা হচ্ছে তা হলো, ক) ভূতাত্ত্বিক গঠন ও প্লেট - টেকটনিক প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ করা এবং ভূকম্পনের সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাষ পাওয়া, খ) অট্টালিকা, মাটির নীচ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা-ঘাট ও পাইপ লাইন, ব্রীজ, উড়াল পথ এবং পাতাল রেল প্রভৃতির ভিতও গঠন ভূকম্পন সহ্য করার ক্ষমতা সম্পন্ন করার উদ্দশ্যে উন্নত কারিগরী পদ্ধতির উদ্ভাবন করা।

(বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী, বিজ্ঞান ও সমাজ বিষয়ক দ্বি - মাসিক পত্রিকা, জুলাই - আগষ্ট ১৯৯০, B – 2 বৈশাখী, 153 / 1 যশোহর রোড, কলিকাতা – 700 114)

Add new comment

This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

16 + 2 =
Solve this simple math problem and enter the result. E.g. for 1+3, enter 4.

More From Author

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

Latest