পানীয় জল (Drinking Water)

Submitted by Hindi on Sat, 03/26/2016 - 09:52
Printer Friendly, PDF & Email

পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল মানেই কি পৃথিবীতে পানীয় জলের অভাব নেই? বরং উল্টোটাই সত্যি! সারা পৃথিবী জুড়ে আজ নিরাপদ পানীয় জলের হাহাকার| কিন্তূ কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে জানতে হবে জলের মতনই সহজ কিছু বিষয় সম্পর্কে, যা প্রতিদিন আমরা শুনে থাকি, কিন্তূ সঠিক ধারনা আমাদের নেই| এমনই বিষয় নিয়ে লেখা এটি…

জল : পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ


সৌরজগতের কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব বিঞ্জানীরা আজও পেয়েছেন কি? কেন জানো? পৃথিবীর মতো কোথাও বোধহয় জল নেই| নেই প্রাণ টিকে থাকার মত বাতাসও| তাই জলই হল পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ| আমাদের বেঁচে থাকাতে কি না কাজে লাগে জল| জল পান না করলে আমরা বেঁচে থাকতেই পারতাম না| এছাড়াও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য জল না হলেই নয়| আবার মল মূত্র ত্যাগের পর তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দূরে রাখতে, অর্থাত স্যানিটেশন যাকে বলা হয়, তাতেও জল অপরিহার্য| জল ছাড়া শিল্পের কাজও ভাবাই যায় না| বিপদ আপদ, দুর্ঘটনায়ও জলকে মনে করা হয় খুব প্রয়োজনীয় সম্পদ| এসব কিছু বিবেচনা করে বলা যায়, জল আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক সম্পদ| শুধু জল থাকলেই হবে না, পরিষ্কার পানীয় জল যদি না থাকতো তাহলে জলবাহিত রোগ যেমন, পাতলা পায়খানা, কলেরা, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগে বোধহয় পৃথিবী থেকে মানুষের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেত|

পানীয় জল কোথা থেকে পাই আমরা?


ছোটবেলা থেকেই তো আমরা জানি পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর একভাগ স্থল| তার মানে কিন্তু এই নয় যে সারা পৃথিবীতে পানীয় জলের বিপুল সম্ভার| বরং উল্টোটাই সত্যি, পৃথিবীতে পাওয়া যায় যে জল তার অধিকাংশই পানের উপযুক্ত নয়| আমাদের পানীয় জলের উত্সগুলি মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়| ক) বৃষ্টির জল, খ) পৃথিবীর উপরি তলের জল, গ) মাটির নীচের জল| বৃষ্টির জল হল পৃথিবীতে পাওয়া বিশুদ্ধতম জল| তবে বায়ুদূষণ আজকাল প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে| তাই বৃষ্টির জলও আজ অনেকটাই দূষিত| প্রথম বৃষ্টির জল যখন দূষিত বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নামে তা বাতাসের দূষিত পদার্থ, রোগ-জীবানু, ধুলোবালি নিয়ে দূষিত হয়ে যায়| তবে এক পশলা বৃষ্টি হবার পরে যে জল পাওয়া যায় তাকে এখনও বিশুদ্ধতম জল বলে ধরে নেওয়া যায়| অনেক দেশেই আজ বৃষ্টির জলকে ধরে পানীয় জল এবং জীবনধারণের জন্য অন্য নানা কাজের জল সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয়| এই পদ্ধতিকে বলে ‘রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং’ বা ‘বৃষ্টির জল সংরক্ষণ’ |

পৃথিবীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, নালা, খাল, বিল হল জলের প্রকৃতির উপরি তলের উত্স| আবার মানুষ নিজের প্রয়োজনে যে পুকুর, লেক ইত্যাদি কাটে তাও এই শ্রেণির জলের উত্সের মধ্যেই পড়ে| তোমরা তো অধিকাংশ ছেলে-মেয়েরাই কুয়োর জলের সঙ্গে পরিচিত| বলোতো কুয়োর জল কি ধরণের জল? ঠিকই ধরেছো – এ হলো মাটির নীচের জল| তবে কুয়োর কিন্তু আবার ধরণ আছে| যেমন, অগভীর নলকূপ ও গভীর নলকূপ| কোন কুয়ো কেমন তা জানতে হলে তোমায় বুঝতে হবে মাটির নীচে জল কিভাবে থাকে| তোমাদের হয়তো মনে হতে পারে মাটির নীচ দিয়ে নদীর মতো জলধারা বয়ে যায়| বা অনেকটা জল মাটির নীচে জমানো রয়েছে তার উপরে মাটি ভাসছে| আসলে কিন্তু তা নয়| উপর থেকে গর্ত খুঁড়ে তুমি যদি মাটির নীচে যেতে থাকো তবে দেখতে পাবে মাটিটা স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে| একদম উপরের স্তরটা হল ছিদ্রযুক্ত মাটির স্তর| ছিদ্রযুক্ত মানে মাটির গোল বা ডিম্বাকার কণাগুলির মধ্যে যে জায়গা বা ফাঁক থাকে তাকে বোঝানো হয়| এই ফাঁকা জায়গাগুলোতে জলের কণা থাকে| একটি ছিদ্রযুক্ত স্তরের নীচেই থাকে স্তর বিহীন পাথুরে মাটির স্তর| এখানে মাটির কণা এতো জমাট বেঁধে থাকে যে ছিদ্র প্রায় থাকেই না| আর তাই জল ধরার জায়গাও থাকে না| শুধু তাই নয়, এই ছিদ্রহীন স্তরগুলির মধ্যে দিয়ে জলের উপরে নীচে চলাচলও সম্ভব হয় না| এরকম একটি ছিদ্রহীন মাটির স্তরের ঠিক নীচেই থাকে আবার ছিদ্রযুক্ত অর্থাত জলযুক্ত মাটির স্তর| এভাবেই একের পর এক স্তর সাজানো থাকে মাটির নীচে| অগভীর কুয়ো হল, মাটির সবচেয়ে উপরের যে ছিদ্রযুক্ত জলের স্তর থাকে তার মধ্যকার জল তোলার কুয়ো| আর গভীর নলকূপ বলতে বোঝায় সেই স্তরকে, যা অন্ততপক্ষে একটা ছিদ্রহীন মাটির স্তর অতিক্রম করে অনেক নীচের ছিদ্রযুক্ত মাটির স্তর থেকে জল তুলছে| সুতরাং বুঝতেই পারছো, কেন গভীর নলকূপের জলে দূষিত পদার্থ প্রায় থাকেই না| তবে আজকাল আর্সেনিক দূষণ কিন্তু এই গভীর জল স্তর থেকেই হচ্ছে| তাই গভীর নলকূপের জলও আজ কতটা বিষুদ্ধ তা নিয়ে ভাবার আছে|

ঘরে পানীয় জল :


ঘরে কি করে আমরা বিশুদ্ধ পানীয় জল পাবো? মানুষ যেহেতু সমাজবদ্ধ জীব, তাই ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই ঠিক করা হয়েছে| সারা পৃথিবীতেই এটা মানা হয়| অর্থাত এক জায়গায় অনেকটা জল বিশুদ্ধ করে তা ঘরে ঘরে সরবরাহ করা হয়| শহরে পানযোগ্য জল এভাবেই পাওয়া যায়| মূলত তিনটি ধাপে অনেক মানুষের জন্য এই জল সরবরাহের কাজটি করা হয়|

ক) জল সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ : নদী, পুকুর বা বড়ো জলাধার থেকে জল সংগ্রহ করা হয় এবং বড়ো জলাধারে তা বিশুদ্ধিকরণের জন্য কিছুদিন রেখে দেওয়া হয়|

খ) জল ফিল্টার করা বা ছাঁকা : সাধারণ ব্যাপার ভাবছো তো| মোটেই তা নয়| এই কাজ করতে বিশাল বড় মাপের সব ফিল্টার তৈরী করতে হয়| এদের আকার বড় বড় পুকুরের মতো| এদের বলা হয় ‘ধীর বালি ফিল্টার’ বা ‘স্লো স্যন্ড ফিল্টার’ | আবার কোন কোন সময় বিশাল আকারের ঘরের মধ্যে বড়ো বড়ো নুড়ি পাথর লাগনো ফিল্টারও তৈরী করা হয়ে থাকে যাতে খুব দ্রুত জলকে ফিল্টার করা যায়|

গ) জল জীবানুমুক্ত করা বা ডিসইনফেকশন : ধাপে ধাপে উপরের দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে পাওয়া জলকে জীবীনুমুক্ত করা হয় এর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরিমাণমত ক্লোরিন গ্যাস মিশিয়ে| আমাদের দেশের শহর, রেল স্টেশনগুলিতে আমরা যে বিশুদ্ধ জল পাই তা সবই ক্লোরিন মেশানো জল| তবে গবেষণা বলছে ক্লোরিনের ক্যানসার করার ক্ষমতা আছে| তাই উন্নত দেশগুলি জীবানুমুক্ত বিশুদ্ধ জল পেতে আর ক্লোরিন ব্যবহার না করে তারা ওজোন, আলট্রাভায়োলেট রশ্মি ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করেছে|

এতো গেল সমষ্টিগতভাবে বহু মানুষের জন্য কি করে জল পাওয়া যায় তার কথা| তবে আজও আমাদের দেশে সরকার সমষ্টিগতভাবে গ্রাম-শহরের প্রত্যেক মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারে নি| আর তাই এখানে গ্রামে তো বটেই, অনেক শহরেও মানুষকে ভাবতে হয়, শুধু মাত্র নিজের বাড়ির জন্য কি করে জল পরিশ্রুত করা যায়| এসো, ঘরে নিরাপদ জল পাওয়ার পদ্ধতিগুলি নিয়ে আমরা আলোচনা করি|

ক) টিউবওয়েল বা নলকুপ :
গ্রামের দিকে অনেক বাড়িতেই আজও টিউবওয়েলই একমাত্র ভরসা| তবে, এগুলি কিন্তু অধিকাংশই অগভীর নলকুপ| অর্থাত, মাটির সবচেয়ে ওপরের জলস্তর থেকে জল তোলে| আর আগেই আমরা জেনেছি যে, মাটির নীচে জল পর পর ছিদ্রযুক্ত স্তরে থাকে, আর মাঝে থাকে ছিদ্রহীন মাটির স্তর| সবচেয়ে ওপরের জলযুক্ত মাটির স্তরের জলে রোগ-জীবানু, রাসায়নিক বর্জ্য দিয়ে দূষণের সম্ভাবনা খুব বেশি| কারণ মাটির উপরকার সমস্ত দূষণ চুঁইয়ে মাটির মধ্যে ঢুকে এই জলস্তকে দূষিত করে| তাই আজ আর অগভীর নলকুপ পানীয় জলের জন্য খুব নিরাপদ নয়| দরকার গভীর নলকুপ| অসুবিধা হল, এই নলকুপগুলি তৈরীতে খরচ খুব বেশি, আর আর্সেনিক দূষণের জন্য এগুলিও দায়ী|

খ) নিরাপদ জল ও কুয়ো :
গ্রামের দিকে আজও কিছু মানুষ কুয়োর জলে কাজ সারেন| পানও করেন এর জল| এগুলিও কিন্তু অগভীর কুয়ো| সুতরাং অগভীর নলকুপের সমস্ত খারাপ দিকগুলি এরও আছে| উপরন্তু কুয়োগুলি যেহেতু উপরে ঢাকা থাকে না ফলে সরাসরি দূষিত পদার্থ এর জলকে দূষিত করতে পারে| ফলে অধিকাংশ কুয়োর জল কিন্তু পান করা নিরাপদ নয়| এ ধরণের কুয়োকে নিরাপদ করতে হলে কিছু পরিবর্তন করা দরকার| দড়ি বালতি দিয়ে জল তো তোলা যাবেই না, উপরন্তু কুয়োর মুখ পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে হবে| আর জল তুলতে হবে কুয়োর মধ্যে পাইপ এবং টিউবওয়েল বসিয়ে| কুয়োর চারিধার সিমেন্টে বাঁধানো থাকবে, এবং চারিধারের বর্জ্য জল পাকা নর্দামা দিয়ে অনেকটা দূরে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে| কুয়োর ধারেকাছে কাজকর্ম না করাই ভালো|

গ) ফোটানো জল :
নদী, নালা, টিউবওয়েল, কুয়ো যেখান থেকেই জল পাই না কেন, তা জীবানুমুক্ত করতে ফোটানো যেতে পারে| পদ্ধতি হিসেবে এটা সত্যিই ভালো| তবে কয়েকটা বিষয়ে যে না ভাবলেই নয়| জল ফোটাতে যে জ্বালানী লাগে তার দাম অত্যধিক| তা বহন করার ক্ষমতা থাকা চাই| আরো কয়েকটি ব্যাপার জানতেই হবে| জল টগবগ করে ফুটতে শুরু করার পর অন্তত ২০-৩০ মিনিট ফোটাতে হবে| যে পাত্রে জল ফোটানো হবে সেখানেই রেখে দিতে হবে| অন্য পাত্রে ঢেলে রাখা যাবে না| তাতে রোগ জীবানু আবার ঐ জলকে সংক্রামিত করবে| যে পাত্রে জল ফোটানো ও রাখা হল তা থেকে ব্যবহারের জন্য ঢেলে নিতে হবে| অন্য কোনো পাত্র ঐ জলের মধ্যে ডোবানো যাবে না| ফোটানোর পর ২৪ ঘন্টা পর পর্যন্ত ঐ জল ব্যবহার করা যাবে| এত কিছু মেনে ফোটানো জল ব্যবহার করতে পারেল তা সত্যিই নিরাপদ| ফোটানো জলের স্বাদ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে যায় আর কিছু খনিজ পদার্থও ঐ জল থেকে কমে যায় ফোটানোর ফলে|

ঘ) ব্লিচিং মেশানো জল ঘরেই :
সমষ্টিগতভাবে যেমন ক্লোরিন মেশানো জীবানুমুক্ত জল তৈরী করা হয়, ঘরেও তেমনি ক্লোরিন মেশানো জল পাওয়া যেতে পারে| এজন্য ভালো গুণমানের ব্লিচিং ব্যবহার করতে হবে| সঠিক পরিমাণে ব্লিচিং পাউডার নির্দিষ্ট পরিমাণের জলকে জীবানুমুক্ত করতে পারে| আবার তোমরা তো হ্যালোজেন বড়ির নাম শুনেছো? এগুলিও আসলে জলে ক্লোরিন মেশানোর ট্যাবলেট| বাজারে কিনতে পাওয়া যায় হ্যালোজেন ট্যাবলেট| কতটা জলে এই ট্যাবলেট কটি মেশাতে হবে তার নির্দেশ ট্যাবলেটের প্যাকেটের গায়ে ছাপ থেকে দেখে নিতে হবে|

ঙ) ফিল্টার করা জল :
আগেকার দিনে ঘরে বিভিন্ন রকম ফিল্টার তৈরী করে জলকে নিরাপদ করা হত| আজ বাজারে কিনতে পাওয়া যায় হরেক রকম ফিল্টার| এর মধ্যে ক্যান্ডল ফিল্টার বেশ কম দামের| তবে এই ফিল্টারগুলি জীবানু, পরজীবীকে ছেঁকে বার করে বের করে দিলেও ভাইরাসকে কিন্তু আটকাতে পারে না| তাই ভাইরাস ঘটিত রোগ হবার সম্ভাবনাকে আটকানো যায় না| আর ফিল্টার ব্যহারকারীদের জানা জরুরী, প্রতি সপ্তাহে কিন্তু ফিল্টারের ক্যান্ডলগুলিকে বের করে ফুটিয়ে নিতে হবে| আজকাল বিদ্যুতে চলে এমন কিছু ফিল্টার বাজারে প্রচুর পরিমানে কিনতে পাওয়া যায়| এখানে কিছুটা ছেঁকে, কিছুটা সিলভার আয়নযুক্ত ফিল্টারে ব্যাকটিরিয়াকে আটকে আবার কিছুটা অতিবেগুনিরশ্মির সাহায্যে জলকে জীবানু মুক্ত করে|

জলে পুষ্টি?


জলে কি পুষ্টি থাকে? সত্যি কথা বলতে গেলে খুব সামান্য খনিজ পদার্থ ছাড়া জলে পুষ্টি থাকার কথা নয়| পুষ্টি পেতে হলে অন্য খাবার খাও| তবে আজকাল কিছু বোতলজাত জল কোম্পানি দাবী করে তাদের জলে অমুক-তমুক পুষ্টি রয়েছে| কি প্রয়োজন জল থেকে পুষ্টি পাওয়ার? তাও আবার অনেক দাম দিয়ে? তাই পুষ্টাকর জল কেনার আগে দু’ বার ভেবো|

জলে রোগ জীবানুঃ


জলকে আমরা জীবন বলে থাকি. অথচ দেখো এই জলেই ঘুরে বেড়ায় রাজ্যের রোগ জীবানু| আর এই দূষিত রোগ জীবানু পূর্ণ জল খেলে আমাদের হতে পারে হরেক রকমের জল বাহিত রোগ| আবার দূষিত জল খাবার তৈরীর কাজে ব্যবহার করা হয় তা থেকেও সমান বিপদের সম্ভাবনা আছে| তাইতো আমরা এত গুরুত্ব দিই জীবানুমুক্ত পানীয় খাওয়ার জন্য|এবারে আমরা দেখবো জল থেকে কি কি রোগ হতে পারে.

১) ভাইরাসঘটিত রোগ : হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-ই পোলিওমায়েলাইচিস, বাচ্চাদের রোটাভাইরাসজনিত পাতলা পায়খানা|

২) ব্যাকটিরিয়া থেকে হয় যে রোগগুলো : টাইফয়েড,প্যারাটাইফয়েড জ্বর, রক্ত পায়খানা বা ডিসেন্ট্রি, বিভিন্ন ধরণের ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা আর মারণরোগ কলেরা|

৩)আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া ঘটিত রোগ : আমাশয়, জিয়ারডিয়া নামক পায়খানার রোগ|

৪) কৃমিঘটিত রোগ : সুতোকৃমি, গোলকৃমি, হাইডাটিড হল কৃমিঘটিত রোগ| যেখানে লিভার বা যকৃত, মস্তিষ্কে বিভিন্ন আকারের সিষ্ট বা জলপূর্ণ থলি তৈরী হয়ে জীবনসংশয় পর্যন্ত করতে পারে|

৫) লেপ্টোস্পাইরা রোগ : এই রোগটি তোমাদের একেবারে অপরিচিত হলেও সারা পৃথিবীতে বেশ কিছু মানুষ জলবাহিত এই রোগে ভোগে| এই অসুখে দীর্ঘমেয়াদী জ্বর সঙ্গে জন্ডিস দেখা যায়|

৬) উপরে বলা রোগভোগ ছাড়াও জলে বসবাসকারী কিছু জীবের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগ আমাদের হতে পারে| যেমন – শামুক ছড়ায় সিস্টোসোমিয়াসিস নামক রোগ, সাইক্লোপস নামক অতিক্ষুদ্র জীবের মারফত ছড়ায় গিনিওয়ার্ম রোগ, ফিস টেপওয়ার্ম|

শুধু রোগজীবানু নয়, জলের মারফত আমাদের শরীরে ঢুকতে পারে হরেক রকম ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ যা আমাদের শরীরকে বিকল করার জন্য যথেষ্ট| আর্সেনিক, ফ্লুরাইড ইত্যাদি পরিচিত নাম তো আছেই, এচাড়াও জলে থাকতে পারে ক্ষতিকারক ভারী ধাতু, খনিজ পদার্থ, জৈব অম্ল, নাইট্রোজেনঘটিত যৌগ, ব্লিচিং পদার্থ, বিভিন্ন রকমের ক্ষতিকারক জৈব যৌগ|

জলের জন্য রোগ ভোগের কথা বলতে গিয়ে আর একটি বিষয় না বলেলই নয় যে এই জলেই জীবনের কিছুটা সময় বাস করে মশা| আর এরা ছড়ায় ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া বা গোদের মতো রোগ| সুতরাং সরাসরি জলের জন্য না হলেও জল আছে বলেই মশাবাহিত রোগ আছে বলা যায়|

জলে আর্সেনিক : জলে আর্সেনিক আজকের আধুনিক পৃথিবীর মানুষকে নাকাল করে রেখেছে| মাটির নীচে বিভিন্ন খনিজ পদার্থের মধ্যে থাকে আর্সেনিক| নলকুপ খনন, সেচের জন্য কুপ খনন করে অবাধে জল তোলা ইত্যাদি কারণে প্রতিনিয়ত এই খনিজ পদার্থের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আর্সেনিক মাটির নীচের জলস্তরে মিশে যাচ্ছে| আর আমরা যখন নলকুপের মারফত এই জল তুলে পান করছি তা আমাদের শরীরে অবাধে ঢুকে যাচ্ছে| জলে আর্সেনিকের নিরাপদ মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ০.০১ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার জলে| কিন্তু, আমাদের দেশের বহু জায়গায় যেখানে মানুষ নলকুপের জলের উপর নির্ভরশীল আর অবাধে মাটির নীচের জলকে চাষবাসের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে আর্সেনিক দূষণ মানবজীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে| আর্সেনিক দূষণে চামড়ার কিছু রোগ হয়, যা ক্যানসার পর্যন্ত গড়াতে পারে|

আর্সেনিক জলদূষণ রুখতে তাই বলা হচ্ছে মাটির নীচের জল নয়, নদী, পুকুর ইত্যাদি পৃথিবীর উপরিতল দিয়ে বয়ে যাওয়া জলকে বিশুদ্ধ করে পান করতে| যেসব জায়গায় এইসব জলের হাহাকার, সেখানে মাটির নীচের আর্সেনিকযুক্ক জলকে বিভিন্ন রাসায়নিক পদ্ধতিতে আর্সেনিকমুক্ত করার চেষ্টা চলছে| তবে তা খুব খরচ সাপেক্ষ|

জলে ফ্লুরাইড ভালো না খারাপ : ফ্লুরিন আমাদের শরীরের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় মৌল| মূলত পানীয় জল থেকে আমরা ফ্লুরিন পাই| সামুদ্রিক মাছ, চা, চিজ ইত্যাদি খাবারেও প্রচুর পরিমাণ ফ্লুরাইড আছে| আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য জলে ফ্লুরিনের মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে প্রতি লিটার জলে ০.৫ থেকে ০.৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত| এর থেকে বেশি মাত্রায় ফ্লুরিন ক্ষতিকারক| দেখা গেছে ভারতের অধিকাংশ জায়গায় জলেই ফ্লুরিনের মাত্রা আত্যন্ত বেশি| প্রতি লিটারে ৩থেকে ১২মিলিগ্রাম পর্যন্ত| ফলে এসব জায়গায় জলে ফ্লুরিনের বিষক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী| স্বাভাবিক মাত্রায় ফ্লুরিন আমাদের শরীরে হাড়ের মধ্যে খনিজ পদার্থ ঢুকতে এবং দাঁতের চারিদিকে যে শক্ত এনামেল থাকে তা তৈরী করতে সাহায্য করে| ফলে, জলে ফ্লুরিনের মাত্রা কম হলে দাঁতের ক্ষয়রোগ বা কেরিস দেখা যায়| আবার বেশি মাত্রায় ফ্লুরিন শরীরের পক্ষে বিষাক্ত| তা দাঁত ও হাড়ের বিকলাঙ্গতা তৈরী করে যাকে বলা হয় ফ্লুরোসিস রোগ| এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেখানে জলে ফ্লুরিনের মাত্রা প্রয়োজনের তুলনায় কম সেখানে জলে ফ্লুরিন মেশানো হয়| আবার ঐ জায়গাগুলির মানুষকে ফ্লুরাইড যুক্ত দাঁতের মাজনও ব্যবহার করতে বলা হয়| যাতে দাঁতের ক্ষয়রোগ কমানো যায়| আমাদের দেশের অধিকাংশ জায়গার জলে ফ্লুরিনের মাত্রা মোটামুটি ঠিক থাকলেও, কিছু কিছু জায়গার জলে এর মাত্রা অত্যাধিক| না কমালে বিষক্রিয়া অবধারিত| এবার বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখো প্রায় সব দাঁতের মাজনই ফ্লুরাইডযুক্ত| টেলিভিশনে এই দাঁতের মাজনেরই বিজ্ঞাপনে দাঁতের ডাক্তার বলেন ঐ মাজনের ফ্লুরাইড নাকি দাঁতের ক্ষয় রোধ করতে প্রথম স্থানে আছে| এর জন্য তারা দামও নিচ্ছে দেদার| অথচ আমাদের দরকার ফ্লুরাইড মুক্ত মাজন| কি সহজে আমাদের বোকা বানানো হচ্ছে তাই না?

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा