খরা ভালো কাজেরও

Submitted by Hindi on Sun, 07/24/2016 - 12:56
Printer Friendly, PDF & Email
Source
অনুবাদঃ সঞ্জয় অধিকারী

আমাদের এখানে পুকুর, কুঁই ও কুয়োতে আজও জল নেওয়ার ব্যাপারে এই আপ্যায়ন দেখা যায়- ‘প্রথমে আপনি জল নিয়ে নিন, পরে আমি নেবো’। জলই আমাদের এখানে সামাজিক বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। তাই দেশের অন্যান্য জায়গায় যখন জলের কারণে সামাজিক সম্বন্ধ ভেঙ্গে যেতে দেখি আমাদের খুবই খারাপ লাগে।

টেলিভিশন কোথায় নেই? আমাদের এখানেও আছে, আমাদের এখানে মানে জয়সলমের থেকে কয়েকশো কিলোমিটার পশ্চিমে পাকিস্তানের বর্ডার| এটাও বলে রাখি দেশের মধ্যে সবথেকে কম বৃষ্টি হয় আমাদের এখানে| কখনও কখনও তো হয়ই না| জনসংখ্যা অবশ্যই কম কিন্তু কম লোক হলেও তাদের প্রয়োজনের মত জল তো চাই| তবে এখানে চাষবাস কম হয়, পশুপালনই বেশি| লক্ষ লক্ষ ছাগল, ভেড়া, গরু ও উটের জন্যও তো জল দরকার|

বিগত বেশ কিছুদিন থেকেই আমরা দেশের বেশ কিছু রাজ্যের খরা পরিস্থিতির ভয়ঙ্কর সব খবর দেখছি এই টিভিতেই| কিছুদিন আগে এতে আবার নতুন করে ক্রিকেট বিবাদ যোগ হল| আগামী দু-চার দিনে বিবেকবান কোন মহামান্য বিচারপতি কোন ভাল রায়-ও দেবেন|

আপনার এরিয়ায় কত বৃষ্টি হয় সেটা আপনিই বলতে পারবেন, আমাদের এখানে বিগত দু-বছরে মোট কত বৃষ্টি হয়েছিল তার একটা বিবরণ আপনাদের জানাতে চাই| ২০১৪সালের জুলাই মাসে ৪ এম.এম. আবার আগষ্ট মাসে ৭ এম. এম. মানে সব মিলিয়ে ১১ এম.এম. বৃষ্টি হয়েছিল| তখনও কিন্তু আমাদের রামগড়ের নাম খরার খবরে আসে নি| আমরা সেরকম পরিস্থিতি তৈরী হতে দিই নি| এর আগের বছর ২০১৫ -র জুলাইতে ৩৫ এম.এম, ১১ আগস্টে ৭ এম.এম. এবং ২১ সেপ্টেম্বরে ৬ এম.এম. বৃষ্টি হয়| এইটুকু বৃষ্টিতেও আমরা আমাদের ৫০০ বছরের পূরনো বিপ্রসর নামের পুকুরটি কানায় কানায় ভরে নিয়েছি|

আমাদের এখানে অনেক বিশেষ পুকুর রয়েছে| লক্ষ লক্ষ বছর আগে প্রকৃতিতে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর উথাল-পাথালে এই পুকুরগুলোর নীচে খড়িয়া মাটির একটি পরত বা প্রলেপ জমে যায়| মাটির এই প্রলেপের জন্যই বৃষ্টির জল গিয়ে মরুভূমির নীচে বয়ে যাওয়া নোনা জলের সঙ্গে মিশতে পারে না| বৃষ্টির জল বালিতে বাষ্পের আকারে সুরক্ষিত থাকে| এই আর্দ্রতাকে আমরা ‘রেজওয়ানি পানি’ বলি|

পুকুরভরা (উপরিতলের) জলে কয়েক মাস গ্রামের লোকের কাজ চলে যায়। একে আমরা পালন ‘পানি বলি’। এই বিষয়টির পুরো বিজ্ঞানের মধ্যে আমি এখন যাচ্ছি না, কিন্তু পুকুরের উপরিতল শুকিয়ে যাবার পর ভেতর যে আর্দ্রতা জমে থাকে, জানি না কখন থেকে আমাদের পূর্বাপুরুষ- কুঁই, বেরি এই সব নামের স্থাপত্য বানিয়ে সেই আর্দ্রতাটুকু নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার উপযোগী করে নিয়েছেন| এখন এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ। আমাদের পুকুরে এখনও ভাল রয়েছে। যখন শুকিয়ে যাবে তখন রেজওয়ানি পানি বেরিগুলিতে পাওয়া যাবে, আর আগামী বর্ষা পর্যন্ত আমরা জলের বিষয়ে একদম সাবলম্বী থাকব।

এই বিশেষ পুকুর বিপ্রসরের মতো জয়সলমের এলাকাতে বিশেষ খেতও রয়েছে। এমনিতে তো এই এরিয়াটা পুরোটাই খরা এরিয়া। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে একটা ফসল ওঠে। কিন্তু কোথাও কোথাও খড়িয়া পাথরের স্তর খেতেও পাওয়া যায়। সমাজ এই ক্ষেতগুলিকে শতাব্দী প্রাচীন সময় থেকেই কোন এক পরিবারের কুক্ষিগত হতে দেয় নি। এই বিশেষ ক্ষেতগুলিকে সমাজ সার্বিক করে দিয়েছে। যে কথাটা হয়তো আপনারা শ্লোগানে শোনেন, সেই কথা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে করে দেখিয়েছেন আমাদের সমাজের পূর্বপুরুষেরা। আজকের এই মার-কাটারির সময়ও এই বিশেষ ক্ষেতগুলিতে সর্বজনিক চাষ-আবাদ হয়। এই সর্বজনিক ক্ষেতগুলিতে খরার মধ্যেও সুন্দর ফসল ফলানো যায়।

গত বছর কতবৃষ্টি হয়েছে সেটাতো ওপরে আপনারা দেখলেন। এবার এই হিসেব দেখিয়ে দেশের যে কোন কৃষি বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করুন- দুই-চার সেণ্টিমিটার বর্ষায় কি গম, সরষে, ছোলা, সুরগুজ্ঞার মতো ফসল ফলানো যায়? বিশেষজ্ঞদের উত্তর পাক্কা ‘না’ হবে| কিন্তু এখন আপনি রামগড় আসুন, দেখুন এখানে আমাদের খডিনে এই সমস্ত ফসল এত কম জলেও কি সুন্দর হয়েছে| আর এই ফসল এখন সকলের খামারেই তোলা হচ্ছে| তো এই ধূত্ মরুভূমিতেও, সব থেকে কম বর্ষার এলাকাতে এখনও ভরপুর জল আছে, আনাজ আছে আর পশুদের জন্যও ভরপুর চারা আছে| এটা বলতেও সঙ্কোচ হচ্ছে যে- এই কম জলেও যে ফসল হয়েছে তা শুধু আমাদেরই কাজে লাগাচ্ছে এরকম নয়| এই ফসল কাটতে দূর দূর থেকেও মানুষেরা প্রথমবার এসেছেন| এঁদের মধ্যে বিহার, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, মালওয়া থেকেও মানুষেরা প্রথমবার এসেছেন| মানে যেখানে আমাদের থেকে অনেক বেশি বর্ষা হয় এমন জায়গার লোকেরাও এখানে কাজ পেয়ে যাচ্ছেন|

সরকারী বা কোন এন.জি.ও.-র নাম বা সাইনবোর্ড এখানে ঝুলতে দেখতে পারেন না। এগুলি আমরা আমাদের নিজেদের জন্য তৈরী করেছি| তাই এগুলি কানায় কানায় জলে ভরে রয়েছে।

মরাঠওয়াড়া, লাতুর-এর খবর টি.ভি-তে দেখে বড্ড দুঃখ হয়| প্রশাসন জলের উত্সগুলিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে| জল নিয়ে মানুষে মানুষে ঝগড়া হচ্ছে| আর এখানে আমাদের গ্রামে এত কম বৃষ্টি হওয়ার পরও জল বিষয়ে সমাজে পরস্পরের সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক| অতিথি আপ্যায়ন বা অতিথিকে আদর করে খাওয়ানোর রীতি তো সবজায়গাতেই রয়েছে| আপনাদের এলাকাতেও যদি অতিথি আসে তো আদর করে তাকে আগে খাওয়ানো হয়| আমাদের এখানে পুকুর, কুঁই ও কুয়োতে আজও জল নেওয়ার ব্যাপারে এই আপ্যায়ন দেখা যায়- ‘প্রথমে আপনি জল নিয়ে নিন, পরে আমি নেবো’| জলই আমাদের এখানে সামাজিক বন্ধনে বেঁধে রেখেছে| তাই দেশের অন্যান্য জায়গায় যখন জলের কারণে সামাজিক সম্বন্ধ ভেঙ্গে যেতে দেখি আমাদের খুবই খারাপ লাগে|

এর পছনে একটা বড় কারণ হল- ‘নিজের চাদরের দৈর্ঘ্য না দেখে পা মেলা|’ মারাঠওয়াড প্রকৃতি কাছে জল একটু কম পেয়েছে, তারওপর আখের চাষ করে প্রচুর ভূ-জল নিংড়ে নিয়েছে| এখন একটি কুয়োতেই একেবারে তলায় পড়ে রয়েছে একটু জল, আর ওপর থেকে কয়েকশো বালতি ঝুলছে দেখতে পাবেন| এই রকম সমস্যায় পড়েছে এই এলাকা|

কখনও পুরো দেশজুড়ে জল বিষয়ে সমাজের মনে, মানুষের মনে একই প্রকার ভাব-ভাবনা ছিল| আজ নতুন ধরনের চাষ, জল শোষণকারী নতুন নতুন ফসল, কারখানা, পুকুর বুঝিয়ে গড়ে উঠছে শহর| আর এই বেড়ে চলা শহরের সেই সমস্ত সংযমের ভাব সবই মুছে গেছে| তবেই তো আমরা চেন্নাইয়ের মতো ভয়ঙ্কর বানভাসি বা লাটুরের মতো ভয়ঙ্কর খরার মুখোমুখি হচ্ছি| চেন্নাইয়ের এয়ারপোর্ট বন্যায় ডুবে যায় আর লাটুরে রেলে চড়ে জল আসে|

প্রকৃতি হাজার হাজার বছর আগেই ঠিক করে রেখেছে কোথায় কত বৃষ্টি হবে। সকলেই জানেন কোঙ্কন, চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয় প্রচুর পরিমানে, তো আমাদের গ্রামে, জয়সলমেরে খুবই কম| তবে যেখানে যতটা হয়, প্রকৃতির সেই স্বভাব দেখে সমাজ যদি সেইমতো চলার ব্যবস্থা করে, বেশি লোভ না করে, তাহলে বৃষ্টি বেশি হোক বা কম হোক সমাজ সদাই সরস থাকে। এই সরসতাকে আমরা কখনো ছাড়ি নি। আমাদের এখানেও কিছু কিছু গ্রামের বাতাবরণ খারাপ হতে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখন ১০-১৫ (দশ পনেরো) বছর থেকে আবার সুধরে এসেছে। এই সময়েও আমাদের সমাজ ২০০ নতুন বেরিয়া, ১০০ নতুন খড়ীন, ৫ টি কুঁই পতলা মিষ্টি জলের, ১৫০-২০০ তলাই, নডি নিজেদের হিম্মতে, নিজেদের সংস্থানে তৈরী করেছে। সরকারী বা কোন এন.জি.ও.-র নাম বা সাইনবোর্ড এখানে ঝুলতে দেখতে পারেন না। এগুলি আমরা আমাদের নিজেদের জন্য তৈরী করেছি। তাই এগুলি কানায় কানায় জলে ভরে রয়েছে।

দেশে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে জয়সলমের থেকে কম বৃষ্টি হয়। তাই সেইসব জায়গায় জলের কষ্ট দেখে আমাদের খুব কষ্ট হয়। আমাদের কষ্ট তখনই কম হবে যখন আমরা আমাদের নিজেদের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে দেশের এইসব জায়গাতেও আমাদের কাজের বিবরণ, এই ধরণের কাজ পৌঁছে দিতে পারি|

আমাদের এক বন্ধু বলেন খরা একা আসে না| তার আগে আসে ভাল কাজের, ভাল চিন্তাধারার খরা|

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा