জলসিক্ত-বাংলা জলেরই কারণে আজ গভীর সংকটে

Submitted by Hindi on Sun, 10/09/2016 - 11:58
Source
बांग्ला आर्सेनिक : प्रोक्ति ओ प्रतिकार

আর্সেনিক এভাবেই এক বৃহত্ খেলার উপকরণ - টাকার খেলা, রাজনীতির খেলা। মানুষের দুর্দশা হতাশা রোগ যন্ত্রণা যত তীব্র হয়, তত জোরদার জমে খেলা। সবার পক্ষে এত সব বুঝে ওঠার সম্ভব হয় না। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে সরল মনেও অনেকে এ খেলার সামিল হয়ে পড়েন।

জলসিক্ত-বাংলা জলেরই কারণে আজ গভীর সংকটে। সমাজ সংস্কৃতি জীবন বিপন্ন। মাটির নীচে থেকে আহৃত পানীয় জলে মিশে থাকছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক বিষ। আপামর শিশু কিশোর যুবা প্রবীণ বৃদ্ধ সকলে বাধ্য হচ্ছে সেই জল গরল পানে। নেমে আসছে প্রতিকারণহীন রুগণতা বিপন্নতা। জনজীবন ধেয়ে চলেছে এক অমোষ অন্ধকার ভবিতষ্যের দিকে। গ্রস্ত হচ্ছে হতাশা আর বিষাদে। কান্নায় ভেঙে পড়ছে, কাতর আবেদন জানাচ্ছে – একটু বিষমুক্ত পানীয় জল দেবে গো ! হাহাকার আর কান্নার আওয়াজ ডুবিয়ে দেয় ক্ষোভ - স্বাধীনতার হীরক জয়ন্তীর দোরগোড়ায় পৌঁছেও কি বিশুদ্ধ পানীয় জল পাবো না ?

না পাবো না, যদি না এখনও আমরা সজাগ ও তত্পর হই। শুধু তো আর্সেনিক নয়, জলের সমস্যা ব্যাপক ও বহুরকম, সমস্যার পাহাড়। কোথাও প্রকট আর্সেনিক, কোথাও রোগজীবাণু, কোথাও ফ্লোরাইড, কোথাও পেস্টিসাইড। স্থানান্তরে তো সমস্যার রূপ পাল্টায়ই, কালান্তরেও একই জায়গায় ভিন্ন রূপে দেখা দেয়। কোথাও জল থেকেও নেই, কোথাও না থেকেও প্রবলভাবেই আছে। কখনও খরসান খরা কখনও দুর্বার বন্যা – ভাঙন – ঘর বাড়ি সম্পর্ক সবকিছুর। আসলে সমস্যাটা সামগ্রিক জল ব্যবস্থাপনার – আহরণ শোধন বণ্টন ব্যবহার প্রত্যেক ক্ষেত্রে এবং সব মিলিয়ে।

উদার আয়োজনে প্রকৃতি আমাদের চারদিক থেকে জল দিয়ে ঘিরে রেখেছে – মাটির তলায় পুকুরে দিঘিতে সরোবরে নদীতে সমুদ্রে মেঘে বৃষ্টিতে। প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের আছে এক সূক্ষ্ম সুঠাম ছন্দ, স্থিতিতে ও গতিতে ভারসাম্য। সেসবের তোয়াক্কা না করে ক্রমাগত আমরা যদি সেই ছন্দ আর ভারসাম্য বিঘ্নিত করে চলি, বিপদ ঘনাবেই।

পানীয় জলের আর্সেনিকে যে বিপদসংকেত তা, তাই, একক বা বিচ্ছিন্ন নয়। এমনকী শুধু জলেও সীমিত নয়। মাটি বাতাস ফল – মূল, সবজি – শস্য, দুধ, পানীয়, মাছ, মাংস, ডিম সবকিছুতেই আর্সেনিকের অনুপ্রবেশ ঘটাছে। অপুষ্ট শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার যে পক্ষপাতিত্ব, তা অচিরেই ঘুচে যাবে। কেউই রেহাই পাবো না, চোখ বুজে উদাসীন থাকার বিলাসিতার অবকাশ নেই। আমাদের স্বাস্থ্য পুষ্টি প্রগতি উন্নয়ন, পরিবেশের সুরক্ষা সংরক্ষণ সদ্ব্যবহার – সবকিছুই আর্সেনিকের সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীতে আর্সেনিকদূষ্ট পানীয় জলের প্রাদুর্ভাব ধরা পড়লে তার আশু প্রতিকারের চেষ্টা নিশ্চয়ই করতে হবে। কিন্তু সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ মোকাবিলার প্রতি দিকপাত না করে সেরকম প্রচেষ্টায় আখেরে কোনো লাভই হয় না।

অথচ এমনটাই ঘটে চলেছে বার বার। পানীয় জলের এ হেন মহাসংকটে জনসাধারণ স্বভাবতই সরকারের মুখাপেক্ষী. কিন্তু সরকারি নিয়ম - নীতি পদ্ধতির আছে নিজস্ব গতিপ্রকৃতি। পানীয় জলে আর্সেনিকের ব্যাপারে তা যেন এক দুষ্টচক্রে আবর্তিত। প্রথম প্রথম সমস্যাটির অস্তিত্বই অস্বীকৃত হয়। যাঁরা তোলেন, আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগে তাঁরা অভিযুক্তই হয়ে পড়তে পারেন. নানা টালবাহানা চাপানউতোরের পথ বেয়ে একসময় স্বীকৃত হয় সমস্যা। সরকারি বিবিধ দপ্তর আধিকারিক, বিজ্ঞানী - বিশেষজ্ঞ কমিটি ইত্যাদির দায়দায়িত্বের পরিধি নির্দিষ্ট হতে হতে, সমীক্ষা আলোচনার কতটা কি করণীয় বা প্রয়োজন, টাকাপয়সা কোথা থেকে আসবে সেসব বিবেচনা করতে করতে দীর্ঘ সময় গড়িয়ে যায়। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক নানা বাধ্যবাধকতা হিসেবনিকেশ। অবশেষে হয়তো গৃহীত হয় আর্সেনিক দূরীকরণ প্রকল্প। কখনও আসে বিদেশি প্রযুক্তি। অনুদান। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রকল্প উদ্বোধন হয়। বাইরের মানুষজনের আনাগোনা, যন্ত্রপাতি বসানো, স্থানীয় কিছু মানুষের সক্রিয়তা চোখে পড়ে। দু-এক বছরের মধ্যেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে আবার। যাঁদের জন্য এত আয়োজন, তাঁরা থাকেন অপাঙক্তেয়। কেননা তাঁদের না আছে সচেতনতা, না জ্ঞান না দক্ষতা না অর্থক্ষমতা। জ্ঞান দক্ষতা অর্থ না-ই থাকুক, তাঁদের ভালোর জন্যই যে এতসব দাক্ষিণ্যের সমাবেশ এও যেন তাঁরা বুঝতে চান না। মুখ থুবড়ে পড়ে প্রকল্প। নির্বাচন এগিয়ে এলে উত্সাহ আবার জিইয়ে ওঠে, তত্পরতা বাড়ে। স্তোকবাক্যে আশ্বাসে প্রতিশ্রুতিতে প্রগলভ হয়ে ওঠে প্রশাসন।

আর্সেনিক এভাবেই এক বৃহত্ খেলার উপকরণ - টাকার খেলা, রাজনীতির খেলা। মানুষের দুর্দশা হতাশা রোগ যন্ত্রণা যত তীব্র হয়, তত জোরদার জমে খেলা। সবার পক্ষে এত সব বুঝে ওঠার সম্ভব হয় না। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে সরল মনেও অনেকে এ খেলার সামিল হয়ে পড়েন।

তবে ধীরে ধীরে এই সত্যে উপনীত হওয়া গেছে যে আর্সেনিক বিষাক্রান্ত জনগোষ্ঠীগুলিকেও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে সামিল হতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান কারিগরির নিরিখে ভুক্তভোগী মানুষগুলি অজ্ঞান অসচেতন গণ্য হতে পারেন, কিন্তু বাইরে থেকে যাঁরা মানুষের ভালো করতে কারিগরি বা আর্থিক সহায়তা নিয়ে আসতে চান, সচেতকের ভূমিকা পালন করতে চান, তাঁদেরও সচেতনতার পাঠ নেওয়ার প্রয়োজন কম নয়। মানুষের জীবন জীবিকা সংস্কৃতি, চিরাচরিত সামাজিক সামূহিক জ্ঞান, দক্ষতা প্রজ্ঞার সঙ্গে বিজ্ঞানী - বিশেষজ্ঞদের উদ্ভাবিত পন্থাপদ্ধিতর মেলবন্ধনই দিতে পারে সমস্যা থেকে মুক্তির আশু ও দীর্ঘমেয়াদী পথের হদিস। সকলকেই এখানে একসঙ্গে, পরস্পরের পরিপূরক হয়ে কাজে নামতে হবে। বহু বহু ক্ষেত্রে আজ এটা প্রমাণিত, প্রতিষ্ঠিত এবং কাজেও অনেকে নেমে পড়েছেন। আওমাদেরও লগ্ন বয়ে যায়।

মণীন্দ্র নারায়ণ মজুমদার
প্রাক্তন অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, ডীন ফ্যাকল্টি অফ সায়েন্স, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়


Source: Extract from the book titled “Banglay Arsenic: Prokiti O Pratikar” written by Prof. Manindra Narayan Majumder.

Disqus Comment

More From Author

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा