পাণীয় জল ও সাধারণ পরিশোধন ব্যবস্থা

Submitted by Hindi on Sun, 11/13/2016 - 12:16
Printer Friendly, PDF & Email
Source
Aparajito sahityopatra: Jal Bisesh sankhya, Jan-June, 2008

পরিস্রুত জল একটি ছোট ভূগর্ভস্থ জলাধারে রেখে ব্লিচিং পাউডার দ্রবণ মিশ্রিত করা হয়। এই পরিস্রুত জীবাণুমুক্ত জল পাম্পের সাহায্যে বেলুড় মঠের বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করা হয়। এই পরিশোধন কেন্দ্রটি বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এ ধরণের ছোট জল প্রকল্প গ্রামের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী তার প্রধান কারণ গ্রামবাসীরা এ ধরণের জল প্রকল্প নিজেরাই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।

কোলকাতা শহরের দৈনিক চাহিদার প্রায় 90 শতাংশ জল গঙ্গা নদীর জল পরিশোধিত করে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে পলতা এবং গার্ডেনরীচে ভূপৃষ্ঠস্থ জল পরিশোধন কেন্দ্র আছে। গঙ্গা নদীতে বর্ষাকালে ভাসমান কঠিন পদার্থের পরিমাণ অত্যন্ত বেশী থাকে। এই জল পরিশোধন ব্যবস্থায় প্রথমে পরিমাণমত ফিটকিরি বা Alum দেওয়া হয়। পরে ঐ জল একটি গোলাকার জলাধারে পাঠানো হয়। এই জলাধারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মন্থর মিশ্রণ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকে এবং সেই মধ্য অঞ্চলে প্রায় 20-25 মিনিট থাকে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইডের দানা (floc) তৈরী হয় এবং এইগুলি ভাসমান কলয়ডাল কঠিন কণাগুলিকে এবং অন্যান্য বড় ভাসমান কঠিন পদার্থগুলিকে গোলাকার জলাধারের পরের অংশে নীচে থিতিয়ে পড়তে সাহায্য করে। এই গোলাকার জলাধারকে ক্ল্যারিফ্লোকুলেটের (clsriflocculator) বলে। এই গোলাকার জলাধারে flocculation এবং sedimentation দুই প্রক্রিয়াই ঘটে। জলাধারের উপরিভাগ থেকে পরিষ্কার জল নির্গত হয়ে ফিল্টারে আসে। এই ফিল্টারে বালি এবং নুড়িপাথর থাকে। এই ফিল্টারের নাম দ্রুত বালি ফিল্টার বা (Rapid sand filter)। এই ফিল্টার জলে অবশিষ্ট সমস্ত ভাসমান কঠিন পদার্থকে সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। ফিল্টারের পরিস্রুত জল স্বচ্ছ এবং ভাসমান কণা মুক্ত, তবুও এই জলে সামান্য পরিমাণ জীবাণু থাকতে পারে। তাই এরপর ফিল্টারের জলকে জীবাণুমুক্ত করতে ক্লোরিণ মিশ্রিত করা হয়। ক্লোরিণ জীবাণু ধ্বংস করে এবং সময় লাগে প্রায় 30 মিনিট। তাই পরিশোধিত জলকে পরিষ্কার জলাধারে রাখা হয় এবং পরে তা সরবরাহের জন্য পাইপের মাধ্যমে শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জল সরবরাহের সময় একটু বাড়তি (পরিমাণগত) ক্লোরিণ জলে যুক্ত থাকে, তার কারণ পাইপের মধ্যে যদি কোন জীবাণু কোন কারণে প্রবেশ করলে জলের অবশিষ্ট ক্লোরিণ সেই জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করবে। শহরে জল সরবরাহের জন্য ভূপৃষ্ঠস্থ জলের পরিশোধন ব্যবস্থার নিবন্ধে সংযোজিত করা হয়েছে।

ভূপৃষ্ঠস্থ জলের ভাসমান কঠিন পদার্থের পরিমাণ কম থাকলে ফিটকিরি মিশ্রণের প্রয়োজন হয় না। সেক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে জলকে ঘণ্টা দুয়েক কোন আধারে রাখলে ভাসমান কণা থিতিয়ে পড়ে। আধারের উপরিভাগের উপচে পড়া জল বালি এবং নুড়িপাথরের ফিল্টারের মাধ্যমে পরিস্রুত করা হয়। এই ফিল্টারের নাম ধীর বালি ফিল্টার বা Slow sand filter। এই ফিল্টারে জল পরিস্রুতনের হার কম হলেও ভাসমান কণা ও জীবাণু ধ্বংসের জন্য ক্লোরিণ দেওয়া হয়। পাহাড়ী এলাকায় যেখানে ভূপৃষ্ঠস্থ জলে ভাসমান কঠিন পদার্থের পরিমাণ কম সেখানে এই ধরণের প্রক্রিয়ায় জল পরিশোধন করা হয়।

দ্রুত বালি ফিল্টার বা Rapid sand filter-এর মাধ্যমে প্রতি বর্গমিটার ফিল্টার ক্ষেত্র প্রতি ঘণ্টায় 3000 থেকে 6000 লিটার জল পরিস্রুত করতে পারে। কিন্তু ধীর বালি ফিল্টার বা স্লো স্যাণ্ড ফিল্টারের ক্ষেত্রে এই জল পরিস্রুতনের হার প্রতি ঘণ্টায় প্রতি ফিল্টার বর্গ ক্ষেত্রে 100 থেকে 200 লিটার। দ্রুত বালি ফিল্টার গড়ে প্রায় প্রতিদিন পরিষ্কার করা হয় 60-90 দিন অন্তর এবং এক্ষেত্রে ফিল্টারটিকে জলশূন্য করে সূর্যের তাপে শুকিয়ে উপরিভাগের জমা ময়লা সরিয়ে ফেলা হয়। ধীর বালি ফিল্টারের জল পরিশোধনের মান দ্রুত বালি ফিল্টারে তুলনায় অনেক বেশী, বিশেষত জলের জীবাণু অপসারণের ক্ষমতা ধীর বালি ফিল্টারে প্রায় শতকরা 99.9 ভাগ।

ভূপৃষ্ঠস্থ জলে ভাসমান কঠিন পদার্থ বেশী থাকলেও এই জলকে পরিশোধন করতে খুব সাধারণ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। গঙ্গা নদীতে বর্ষাকালে প্রচুর পরিমাণে ভাসমান কঠিন পদার্থ থাকে। কিন্তু এই জল বোতলবন্দী করে যদি 10-12 দিন রাখা যায় তবে দেখা যায় বোতলের উপরিভাগের জল স্বচ্ছ, বোতলের নীচে ভাসমান কঠিন পদার্থ জমা হয়েছে। একটি পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসের বোতলের উপরিভাগের জল রাখলে জলের স্বচ্ছতা প্রমাণিত হয়। এই বিষয়টি অণুকরণ করে নদীর জল নিকটস্থ একটি পুকুরে (পাম্প লাগিয়ে) রাখা হয়। পুকুরে জলের অবস্থান সময় অন্তত 10-12 দিন রাখা বাঞ্ছনীয়। এই সময়ের মধ্যে জলের ভাসমান কঠিন পদার্থগুলি পুকুরের নীচে থিতিয়ে পড়ে। পুকুরের উপরিভাগের জল এরপর ধীর বালি ফিল্টারের মাধ্যমে পরিস্রুত করা হয়। জল সরবরাহ করার আগে পরিস্রুত জলে ব্লিচিং পাউডারের দ্রবণ অথবা সোডিয়াম হাইড্রোক্লোরাইডের দ্রবণ মিশ্রিত করা হয় জলে অবস্থিত অবশিষ্ট জীবাণু ধ্বংসের জন্য।

লেখক একটি গবেষণামূলক কাজ হিসাবে (ইউনিসেফ প্রদত্ত সাহায্যে) বেলুড় মঠে 1990 সালে গঙ্গার জল পরিশোধনের একটি গোষ্ঠী নির্ভর নতুন পদ্ধতি হিসাবে উপরিবর্ণিত পদ্ধতির প্রয়োগ করেন। গঙ্গার জল পাম্পের মাধ্যমে তুলে মাঠের আয়তন এবং জল পরিশোধনের চাহিদার অঙ্কে পুকুরে জলের অবস্থান সময় 20 দিন পাওয়া যায় এবং এই সময়ে বর্ষাকালে প্রায় শতকরা 99 ভাগ ভাসমান কঠিন পদার্থ অপসারিত হয়। এরপর এই পুকুরের জল পাম্পের সাহায্যে একটি মাটির তৈরী আধারে রাখা হয় এবং এখানেও প্রায় শতকরা 60 ভাগ ভাসমান কঠিন পদার্থ থিতিয়ে অপসারিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আধারের থেকে নির্গত জল ধীর বালি ফিল্টারের মাধ্যমে পরিস্রুত করা হয়। পরিস্রুত জল একটি ছোট ভূগর্ভস্থ জলাধারে রেখে ব্লিচিং পাউডার দ্রবণ মিশ্রিত করা হয়। এই পরিস্রুত জীবাণুমুক্ত জল পাম্পের সাহায্যে বেলুড় মঠের বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করা হয়। এই পরিশোধন কেন্দ্রটি বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এ ধরণের ছোট জল প্রকল্প গ্রামের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী তার প্রধান কারণ গ্রামবাসীরা এ ধরণের জল প্রকল্প নিজেরাই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন।

ভূপৃষ্ঠস্থ জলের পরিশোধনের আর একটি বিকল্প ব্যবস্থা সমান্তরাল অমসৃণ ফিল্টার ও ধীর বালি ফিল্টারের প্রয়োগ। প্রথমে ভূপৃষ্ঠস্থ জলের প্রায় 98-99 ভাগ ভাসমান কঠিন কণা অপসারিত হয়। এই পরিশোধন ব্যবস্থায় ফিটকিরি বা Alum প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। পুকুরের বা দীঘির জল এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধন করা যায়। গ্রামবাসীরা মিলিতভাবে এ ধরণের জল পরিশোধন ব্যবস্থা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন। লেখক 1993 সালে প্রথম সমান্তরাল অমসৃণ ফিল্টার ব্যবস্থার প্রয়োগ করেন হুগলী জেলার কয়েকটি গ্রামাঞ্চলে। এগুলি গবেষণামূলক কাজের অন্তর্গত ছিল। সবথেকে বড় পরিশোধন ব্যবস্থা হুগলী জেলার কামারপুকুরে রাখা হয়। বর্তমানে সমান্তরাল অমসৃণ ফিল্টারের ব্যবহার আমাদের দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।

ভূপৃষ্ঠস্থ জল পরিশোধনের জন্য অর্থের প্রয়োজন। অর্থব্যয় নির্ভর করে জল পরিশোধন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থার উপর। কলকাতা শহরে গঙ্গা নদীর জল পরিশোধনের জন্য খরচা পড়ে প্রতি 1000 লিটারের জন্য 3টাকা 50 পয়সা।

আমাদের দেশে ভূপৃষ্ঠস্থ জল এবং প্রধান নদীগুলি বিভিন্ন কারণে দূষিত হচ্ছে। এই দূষণের কারণগুলি হল শহরের তরল বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে নিক্ষেপ, কলকারখানার বর্জ্যতরলের নদীর জলের সঙ্গে মিশ্রণ, বৃষ্টির জলের সঙ্গে কীটনাশক রাসায়নিক সার, কৃষিজ ময়লা প্রভৃতির মিশ্রণ ও নদীর জলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, গবাদি পশুর মল ও বর্জ্যতরল নদীতে নিক্ষেপ, শহর ও কলকারখানার কঠিন আবর্জনা নদীতে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলা এবং মৃতদেহ নদীতে নিক্ষেপ প্রভৃতি। কিন্তু নদীর জল-দূষণ বৃদ্ধি হলে চলিত জল পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। বিকল্প কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। জল-দূষণ রোধে আইনের ব্যবস্থা থাকলেও পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক ত্রুটির ফলে ভারতবর্ষের নদীগুলি চরম দূষণের শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন।

জলের সমস্যা সমাধানের আর একটি বিকল্প ব্যবস্থা বৃষ্টির জল সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার। বৃষ্টির জল বাড়ীর ছাদ থেকে সংগ্রহ করে আধারে সংরক্ষণ করা যায়। পানীয় ও রান্নার জল সারা বছর সংরক্ষিত জলাধার থেকে ব্যবহার করা যায়। এই ব্যবস্থার জন্য কিছু নিয়মাবলী মেনে চলা প্রয়োজন। বৃষ্টির জল পুকুরে সংগ্রহ করা যায়। গার্হস্থ কাজে এই জল ব্যবহার করা যায়, তবে সেক্ষেত্রে জল পরিশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সমান্তরাল অমসৃণ ফিল্টার পুকুরের জলকে পরিশোধন করতে পারে।

বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে ঐ জল ভূগর্ভস্থ জলাধারে পুনস্থাপন করা যায়। এ ধরণের ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে করা প্রয়োজন। বৃষ্টির জল ব্যবহারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার অনেকটাই হ্রাস পাবে ভূগর্ভস্থ জলের ঘাটতি রোধ হবে।

জলের অপচয়ও এখন প্রধান সমস্যা। কৃষিকার্যে, কলকারখানায় এবং পারিবারিক ক্ষেত্রে জলের অপচয় বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের শহরগুলিতে জল অপচয়ের পরিমাণ শতকরা 32ভাগ থেকে 42ভাগ। জলের এই অপচয় রোধে ব্যাপক কর্মসূচী নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ জরুরি।

পানীয় জলের গুণগত মান রক্ষা করা প্রত্যেকটি সরবরাহকারী সংস্থার দায়িত্ব। নিয়মিত জলপরীক্ষা, জলের উত্স ও পরিশোধন ব্যবস্থা ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়মিত পরিদর্শন এবং নজরদারী অত্যন্ত জরুরী। সম্প্রতি জলের গুণগত মান পরীক্ষাও নজরদারি কর্মসূচী ভারতবর্ষের গ্রামীণ এলাকায় ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সাধারণ গ্রামবাসীদের যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জলসংরক্ষণ, জলের অপচয় বন্ধ, নিরাপদ জল ব্যবহার, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধান প্রভৃতির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব জনচেতনা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া একান্ত জরুরি।

Source: Aparajito sahityopatra: Jal Bisesh sankhya, Jan-June, 2008

सम्पर्क


অরুণাভ মজুমদার
অবসরপ্রাপ্ত ডিরেকটর, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ এন্ড হাইজিন


More From Author

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा