গঙ্গা দূষণ মুক্তি সম্ভব যদি

Submitted by Hindi on Thu, 01/12/2017 - 12:27
Source
সুন্দরবন শ্রমজীবী হাসপাতালের মুখপাত্র “লোকগাথা”, দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

যেটা করার কথা, সেটা করা হচ্ছে না, পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কাজের কাজ হবে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, আমরা যদি আধ্যাত্মিকতার ডামাডোলে বদ্ধ না হয়ে পরিবেশ সচেতন হই, সমাজ সচেতন হয়ে সমাজবদ্ধ মানুষ হয়ে উঠি।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা, সর্বস্তরের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মারাত্মক দূষণের হাত থেকে গঙ্গাকে কিছুতেই মুক্ত করা যাচ্ছে না।

গঙ্গার উত্সস্থল গঙ্গোত্রী হিমবাহ-তুষার স্রোত, যা গোমুখ (বা গোরুর মুখ) নামে পরিচিত। 2525 কিমি দীর্ঘ গঙ্গায় মোটামুটি 525 কিউবিক মিটার জল বয়ে চলেছে। বৃষ্টি, শিলাবর্ষণ, তুষারপাত প্রসূত অধঃপতিত জল কমপক্ষে 10,93,800 স্কোয়ার কিমি সঞ্চিত হয়ে গঙ্গা নদীতে বহমান হয় গঙ্গাসাগর পর্যন্ত। এই দীর্ঘ পথে 29টি প্রথম শ্রেণির শহর ( যাদের জনসংখ্যা কমপক্ষে 1,00,000 এর মতো ), 23টি দ্বিতীয় শ্রেণির শহর ( যাদের জনসংখ্যা কমপক্ষে 50,000 থেকে 1,00,000 এর মতো ) এবং 48টি শহরাঞ্চল ( যাদের জনসংখ্যা কমপক্ষে 50,000 এর মতো )- এর দূষিত জল গঙ্গায় মিশছে। 550 মিলিয়ন জনপূর্ণ গঙ্গার তটবর্তী দুপাশের নগর, গ্রাম, জনপদ, শহর, শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য, পয়ঃ প্রণালীর দূষিত জল অবিরত গঙ্গায় মিশছে। এছাড়া তটবর্তী শ্মশানের শবদাহের পরে উদ্ভূত দেহাবশেষ, মৃত জীবজন্তুর দেহাবশেষও ফেলা হচ্ছে। উত্সবাদির মরশুমে প্রতিমা নিরঞ্জন, ব্যবহৃত ফুলও গঙ্গাতে ফেলা হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয় প্লাস্টিকজাত বর্জ্য পদার্থ যা বেশ কিছু মিউনিসিপালিটি যত্রতত্র গঙ্গার ধারে জমা করছে, বৃষ্টির সময় গঙ্গাতে মিশছে।

1985 সাল থেকে গঙ্গার দূষণ কমানোর প্রকল্প শুরু করা হয় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উদ্যোগে। 1986 সালে শুরু হয় গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান – 1 (গ্যাপ – 1) এর কাজ উত্তরপ্রদেশের 6টি শহর, বিহারের 4টি এবং পশ্চিমবঙ্গের 15টি শহরকে (মোট 25টি) এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছিল। প্রকল্পের জন্য খরচা ধরা হয়েছিল 451,70 কোটি টাকা এবং বলা হয়ে ছিল কাজটি শেষ করতে হবে 31 মার্চ, 2000 সালে। মূল উদ্দেশ্য ছিল শহর ও কলকারখানা উদ্ভূত যে দূষিত জল প্রতিদিন গঙ্গায় পড়ে তাকে পরিশোধিত করে ফেলা হবে। পাশাপাশি গঙ্গাপাড়ে যে নানা ধরনের দূষণ হয়, তাকে রোধ করা। যেমন – শ্মশান ঘাটগুলিকে বৈদ্যুতিকরণ, নদীর তীরে যে মল-মূত্র ত্যাগ করা হয় তা বন্ধ করা, স্নান-ঘাট ও কমিউনিটি শৌচালয় তৈরী করা। সেই মতো কাজও শুরু হয়েছিলো।

1994 সালে গ্যাপ-1 এর রিভিউ বৈঠকে প্রকল্পে বাজেট বাড়িয়ে 462,04 কোটি করা হয় যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ 183 কোটি টাকা খরচ করে, তৈরী হয় 45টি বর্জ্য ট্রিটমেণ্ট প্ল্যাণ্ট, 170টি সুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশন। 35টি শ্মশানের বৈদ্যুতিকরণ, 400 কিমি সুয়ারেজ লাইন তৈরি হয়। প্রকল্পের টাকার 70 শতাংশ দেবে কেন্দ্র সরকার, বাকিটা রাজ্য সরকারের এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বসহ। কাজ শুরু হলেও সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল ঠিকমতো কাজ চলছে না। গঙ্গা দূষণমুক্ত হলো না। 1997 সালে আরো 60টি শহরকে এই প্রকল্পের আওতায় এনে মোট 85টি শহরে গঙ্গা পরিশোধনের কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পের অধীনে গঙ্গার ঘাট সংস্কার, পাড় সাজানো, আরো কয়েকটি শ্মশানঘাটের বৈদ্যুতিকরণ করা হবে। এরপর 2009 সালের ফেব্রুয়ারী মাসে গঠিত হয় ন্যাশনাল গঙ্গা রিভার বেসিন অথরিটি (N. G. R. B.)। এই প্রকল্পের আওতায় গঙ্গাতীরের সৌন্দর্যায়নসহ একাধিক বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং গত পাঁচ বছরে এই প্রকল্প খরচ করছে প্রায় হাজার কোটি টাকা তবুও গঙ্গা দূষণ মুক্ত হয়নি।

নদী দূষণের মাত্রা কিন্তু কমেনি। যদিও গঙ্গার দুপাশে গড়ে ওঠা অজস্র ছোট-বড় শিল্পাঞ্চলের কলকারখানার বর্জ্য গঙ্গাবক্ষে এসে যাতে না মেশে তার জন্য কড়া জরিমানা এবং শাস্তি বিধানের কথা শোনা গিয়েছিল, কিন্তু কার্যে পরিণত হয়নি। বর্তমান সরকার এন. জি. আর. বি. –র পুরোনো প্রকল্পটির পরিবর্তে ‘নমামি গঙ্গে’’ মিশন নামে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের অন্তর্গত রিভার ফ্রণ্ট ম্যানেজমেণ্টের জন্য দেশের 118টি শহরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ রাজ্যে আছে 44টি পুর এলাকা যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে আছে মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, নবদ্বীপ, ভাটপাড়া, গাড়ুলিয়া, কল্যাণী, বরানগর, গঙ্গাসাগর এবং উত্তরপাড়া - কোতরংপুর এলাকা। গঙ্গাপাড়ের এই পুরসভাগুলির অধীনে থাকা ঘাটগুলো ভেঙে পড়েছে বা বসে যাচ্ছে। নমামি গঙ্গে মিশন প্রকল্পে মূলতঃ বলা হচ্ছে-

(1) গঙ্গার ধারে যে সমস্ত সুয়ারেজ ট্রিটমেণ্ট প্ল্যাণ্টগুলো আছে সেগুলোকে কার্যকরী অবস্থায় আনা,
(2) গঙ্গার ধারের বসতি ও বস্তি থাকলে, সেগুলিতে 100 শতাংশ নিকাশির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা,
(3) সচেতনতা বাড়িয়ে এটিকে একটি গণ আন্দোলনের রূপ দেওয়া,
(4) গঙ্গার দূষণ নিয়ন্ত্রণই শুধু নয়, গঙ্গার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা,
(6) যে সমস্ত ঘাটে, প্রতিমার কাঠামো এবং অন্যান্য উপকরণ ফেলা হয়, তা থেকে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথক করা। জৈব বর্জ্য থেকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে জৈব রং অজৈব বর্জ্যগুলিকে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেণ্টের ব্যবস্থা করা,
(7) গঙ্গার কোথাও ওপেন ড্রেনের মাধ্যমে নোংরা জল ফেলা হচ্ছে কি না, সে বর্জ্যের প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা।

যেটা করার কথা, সেটা করা হচ্ছে না, পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কাজের কাজ হবে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, আমরা যদি আধ্যাত্মিকতার ডামাডোলে বদ্ধ না হয়ে পরিবেশ সচেতন হই, সমাজ সচেতন হয়ে সমাজবদ্ধ মানুষ হয়ে উঠি।

सम्पर्क


ড. অরুণকান্তি বিশ্বাস
প্রাক্তন পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা ও ডেপুটি ডাইরেক্টর, ন্যাশানাল এনভায়রনমেণ্টাল ইঞ্জিনীয়ারিং রির্সাচ অনস্টিটিউট (নিরী), কলকাতা


Disqus Comment