জল ও প্রাচীন ভারত

Submitted by Hindi on Mon, 03/27/2017 - 07:30
Source
গোপালপুর কলম সোসাইটি পরিচালিত পাক্ষিক সংবাদপত্র ‘দুর্বার কলম’, ‘জল’ উত্সব সংখ্যা 2016.

সেই কোন সুদূর অতীত থেকে জল, জমি ও জঙ্গলই মানব সভ্যতার ভিত্তিভূমি। আজও এ অবস্থার রূপান্তর কাম্য নয়। তবে বর্তমান ধনকুবেরদের অর্থনীতি ও রাজনীতি যে বিশ্ব পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে তা উন্নয়ন নির্ভর বিশ্বায়ন। গালভরা নাম অথচ গোটা উন্নয়ন চ্যাপ্টারটাই সন্ত্রাসবাদী - সমগ্র জীব - পরিমণ্ডল, জড় - পরিমণ্ডল সন্ত্রাস্ত ও বিধ্বংসী বিভীষিকার মুখোমুখি।বৈদিক যুগের চিন্তাশীল মানুষেরা প্রকৃতি ও পরিবেশের মাঝে শক্তি ও সৌন্দর্য সন্ধান ও আবিষ্কার করেছেন। ঋগ্বেদের যুগে পশুদের জন্য জলপানের ব্যবস্থা ও মানুষের পানীয় জলের বিশুদ্ধিকরণ ও সংরক্ষণের কথা পাওয়া যাচ্ছে। সামবেদে জীবন ও জলের গুরুত্ব, বাস্তুতন্ত্রে জলের ভূমিকা, জলচক্র ইত্যাদি সম্বন্ধীয় পরিবেশ ভাবনা লক্ষণীয়। বৈদিক যুগে ‘গো’ শব্দের অর্থ জল, রশ্মি, বাক্য, পৃথিবী, গোরু ইত্যাদি এবং বৈদিক ভাষায় জলের 101 নাম প্রচলিত ছিল। এ যুগে জলকে বলা হয় most democratic liquid, সে যুগে elixir of life, অন্নের ( = খাদ্যের ) আশ্রয় জল। ‘অন্তঃকোষ’ পদার্থে জলই হল প্রধান প্রবাহী তরল। তাই জলধারার সঙ্গে জীবনধারার তুলনা করা হয়। ‘হে জল তুমি সুখের আধারস্বরূপ’ । ‘হে মন্ডুক কন্যা, যেরূপ শব্দে বৃষ্টি হয়, সেইরূপ শব্দ কর’. জীবনযাত্রার সব পর্যায়ে জলের উপর এই নির্ভরতা আজও রাজনীতির মানদন্ড। চিরপ্রবাহী নদীর উপর বড়ো বড়ো বাঁধ না দেওয়া, নদী পথের ভৌগোলিক পরিবর্তন না করা, জলচক্রীয় সংস্থানের বিকৃতি না ঘটানো, অন্যকে বঞ্চিত করে জলের স্বার্থপর মজুতদারি বন্ধ করা; কূপ জলাশয় বা পুষ্করিণী থেকে পানীয় জল অপহরণ না করা, দিঘি ও হ্রদের জল অপব্যবহার না করা - এসব যদি প্রাচীন ভারতে মান্য হয়, আজকে নয় কেন ? গঙ্গা জলের ও গঙ্গা নদীর পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য ব্রাহ্মান্ড পুরাণে কঠোর নির্দেশ ছিল। এমনকি গঙ্গার পবিত্র পানিতে শৌচ্য, আচমন, গাত্র সংবাহন, মল ঘর্ষণ, বস্ত্র ত্যাগ, ফুল – মালা - নির্মাল্য ইত্যাদি বিসর্জন না দেবার 13টি বিধি ছিল।

জল ও কলম্বাসপূর্ব আমেরিকা


সেই কোন সুদূর অতীত থেকে জল, জমি ও জঙ্গলই মানব সভ্যতার ভিত্তিভূমি। আজও এ অবস্থার রূপান্তর কাম্য নয়। তবে বর্তমান ধনকুবেরদের অর্থনীতি ও রাজনীতি যে বিশ্ব পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে তা উন্নয়ন নির্ভর বিশ্বায়ন। গালভরা নাম অথচ গোটা উন্নয়ন চ্যাপ্টারটাই সন্ত্রাসবাদী - সমগ্র জীব - পরিমণ্ডল, জড় - পরিমণ্ডল সন্ত্রাস্ত ও বিধ্বংসী বিভীষিকার মুখোমুখি। অধিকাংশ মানুষের জীবিকা ও জীবন আর যাপন জলে - জঙ্গলে, সমুদ্র - উপকূলে, খাল – বিল - নদীপাড়ে, পুষ্করিনী - সরোবর, জলাশয় - দিঘি পুকুর – ডোবা - পাড়ে। অথচ উন্নয়নের লক্ষ্য এগুলোকে ধ্বংস করা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি। রাজা ( শাসক ) ও বণিকের ভেদরেখা মুছে যাচ্ছে ক্রমশ। লোভ আর মুনাফা ও বিধ্বংসী আগ্রাসন -জল, স্থল - অন্তরীক্ষ সর্বত্র। সবদিকে ভোগের আকাঙ্খার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এদিকে জন স্ফীতি ও জল স্ফীতি দুই-ই সমাপন্ন প্রায়। বিশ্বায়মন অতি দ্রুত ফলপ্রসূ করে তুলছে বিশ্ব - ঊষ্ণায়নকে। অথচ জলেই জীবন, জীবনের আর এক নাম জল !

যে মায়া সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব যুগেই শূন্য (0) আবিষ্কার করে ফেলেছিল, সেই মায়ারা ভৌগোলিকভাবে সভ্যতা গড়ার পক্ষে অতি প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেছিল কীভাবে ? মায়ারা চাষের ও পানের অযোগ্য নোনা জলে, জলাশয়ে প্রচুর চুনা পাথরের গুঁড়ো ছিটিয়ে দিত, নুন থেকে যেত ঐ চুনা পাথরের গুঁড়োয় ঢাকা। জল পানের উপযুক্ত হয়ে যেত। এছাড়া যেখানে বন্যার প্রবণতা বেশি, সেখানে ওরা চাষের জন্য জমি তৈরি করত প্রয়োজন মতো উঁচু করে। অথচ গরু - ঘোড়া ছিল না - পুরোপুরি মানব শ্রম। আজতেকদের বিশাল হ্রদের মাঝখানে শহর রাজধানী তেনোচতিতলান -এ পানীয় জল আসত মূল স্থল ভাগের ঝরনা থেকে, কৃত্রিম জল প্রাণীর মাধ্যমে। আজতেকদের বাগান, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানাও ছিল। বাগানে কৃত্রিম হ্রদ, ঝরনা ও খাল থাকত। নোনা জলের জলাশয় থাকত নোনা মাছ আর মিষ্টি জলের মাছের জন্য মিষ্টি জলের জলাশয়। তেনোচতিতলান শহরটা ছিল হ্রদের মধ্যে। হ্রদের উত্তরাংশে ছিল নোনা জল, বর্ষাকালে তা ডাঙা ভূমিকেও ডুবিয়ে দিয়ে তাকে চাষের অনুপযুক্ত করে তুলত ( যেন আমাদের সুন্দরবন )।

পাথর ও মাটির গাঁথনি দিয়ে 16 কিলোমিটার লম্বা দেওয়াল তৈরি করে হ্রদের দুই অংশকে এক করে দেওয়া হয়। মাঝে সুইস গেট, বাড়তি জল বেরোনোর। হ্রদের দক্ষিণাংশে এভাবে হয়ে ওঠে মিষ্টি জলের এক বিশাল জলাধার ও মাছ - পুকুর। এরপর নাজকা জল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা – পুকুইয়ো -যা দিয়ে জল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত, সম্ভবত সেচের জন্য। পেরুর সমুদ্র উপকূলের ( 700 মাইল জুড়ে ) চিমু সভ্যতায় মরুভূমির মধ্যে মোচে নদী থেকে সেচের মাধ্যমে তারা 50 হাজার একর জমি চাষ করত। ( মূলত ভুট্টা ও তুলো )। পরিবেশের সাথে শুধু মানিয়ে নেওয়া নয়, পরিবেশকে নিজেদের প্রয়োজন মতো গড়ে নেওয়াটাও মানবজাতির ইতিহাস। বৃষ্টিবহুল আমাজন উপত্যকায় এটাই দেখা গেছে।

জল ও সবুজায়ন


বাংলায় ‘সংখ্যা’ শব্দের অর্থ সম্যক জ্ঞান বা বিচার। মুক্তিকামীদের মধ্যে যারা সম্যক জ্ঞানের অধিকারী তারাই ‘সংখ্যা’। সাংখ্য দর্শনের বিশ্লেষণে পঞ্চভূতের অন্যতম হল অপ বা জল। অস্তিত্ব পালিত হয় যাতে বা যা ব্যাপ্তি করে। আপ + ক্কিপ (0) -ক = অপ। এই অপ অস্তিত্বকে ‘আপের’ দিকে নিয়ে যায় বলে সর্বজীবের পালক জল। সমস্ত অস্তিত্বই জলে পালিত হয় - জলই জীবন। সবুজ আছে মানেই প্রাণ আছে। প্রাণের উজ্জীবনেই সবুজের প্রকাশ এবং তা জলকেন্দ্রিক। ‘সরস’, ‘ইরা’, ‘ইলা’ শব্দের অর্থও জল আর তাই সরস্বতী, ইরাবতী নদী এবং ঐসব নদী তীরের সভ্যতার কথা কাররই অজানা নয়। আর ভারতবর্ষেরই একাংশকে বলা হত ইলাবৃতবর্ষ। ‘অপ’ অর্থ জল বলে ব্রহ্মাকে ‘অব্জযোনি’ ও সমুদ্রকে ‘অব্দি’ বলে। ‘পুষ্কর’ অর্থও জল বা মেঘ - যা থেকে পুষ্করিণী, পুকুর কত কী। ইরাক, ইরাবান, ইরাবত, ঐরাবত ও ইরম্মদ ( গুবিদ্যুত, বজ্র ) শব্দের মূলেও জল বা ইরা। জলের সমর্থক শব্দের দিকে তাকালে জলকে ঘিরে মানুষের প্রয়োজন, আবেগ, সংস্কার, কল্পনা ও ভালবাসার বিচিত্র ও অফুরন্ত প্রকাশ লক্ষ করা যায়। সর্বোপরি জলকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা। যা প্রবাহিত হয় তাই ‘অম্বু’।

নদীর জলকে নদ্যম্বু, বদ্বুদকে অম্বুবিম্ব বলে। অম্বুবাচীতে বাংলার কৃষকেরা ভূমি কর্ষণ করে না। মানুষ চিরদিনই জলের মর্ম বুঝেছে, এখন বুঝবে না কেন ? অসীম ভোগাকাঙ্খা মানুষকে উন্মাদ, অস্থিরচিত্ত ও হঠকারী করে তোলে। তখন তার শুভাশুভ - বোধ লোপ পায়। মানুষ যে তৃপ্তিকামী সত্তা আর সৃজন ও মনন তার ঐশ্বর্য ও পরিচয় -এ বোধও লোপ পেতে থাকে। প্রকৃতি, প্রাণ, জগত, জীবন, সৃষ্টি - সকল কিছুর প্রতি অশ্র্দ্ধা, অবজ্ঞা মানুষকে অজ্ঞান ও মূঢ় করে তুলছে। জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই আজকের পৃথিবীতে। মানুষ জীবশ্রেষ্ঠ - এই শংসা মানুষ নিজেই নিজেকে দিচ্ছে। মানুষকে সবার উপরে যাঁরা সত্য বলেছিলেন তাঁরা ছিলেন অধ্যাত্মবাদী ও সম্যক জ্ঞানী। কোনো খন্ড জ্ঞান থেকে এমন উচ্চারণ ছিল না।

উপসংহার বা অম্বুজ রাজনীতি


সেই রাজনীতিই যথার্থ রাজনীতি যা বহুজনের হিত, মঙ্গল ও সুখ বিনিশ্চিত করে। আজকের বিশ্বায়নমুখী উন্নয়ন সর্বস্বতা ক্ষমতার উপস্থিতিকে সর্বগামী ও সর্বব্যাপী করেছে। প্রতি অনুবীক্ষণিক পয়েণ্ট রাষ্ট্র নিজেকে হাজির করছে ও জাহির করছে। ফলে উত্তরাধুনিক রাষ্ট্রসর্বস্বতা সৃজন বা সৃষ্টির পাশাপাশি উপসৃজনও (by-product) করে চলেছে। এহেন বিধ্বংসী উন্নয়ন - পরিকল্পনা সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদকে নতুন উপসর্গ ( উপসৃষ্টি ) রূপে সামনে নিয়ে চলে এসেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যে কাকে শক্রজ্ঞান করছে বোঝা মুস্কিল। বর্তমান বসুন্ধরা গৃহযুদ্ধে দীর্ণ। আমাদের পরিত্রাণ দরকার আর তাই প্রচলিত রাজনীতিকে অতিক্রম করে অম্বুজ সবুজ রাজনীতির চিন্তাভাবনা - যার কেন্দ্রবিন্দু জল, জীবন ও জগত। চলমান পরিবেশ আন্দোলন ও মানবধিকার আন্দোলন এর সৃজনের সহায়ক জোরালো হাতিয়ার। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও বিবেকী, বিবেচক ও বিচক্ষণ মানুষদের এই সবুজ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই। আপাতত দলহীন-ই থাক না এই রাজনীতি, পরে না হয় দলের কথা ভাবা যাবে। বুদ্ধিদীপ্ত ও মুক্ত বুদ্ধির মানুষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলে কী পরিণাম হয় তা আজ বুঝতে পারছি সকলে। ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে’ ?

জল, জীবন ও জনসাধারণ সব একাকার। পুরাণ থেকে জানতে পারি, কালকেয়, ঘোটকী রূপে সূর্যপত্নী সংজ্ঞা ও ইন্দ্র জলের ( জনসাধারণের ) মধ্যে আত্মগোপন করে আত্মরক্ষা করেছেন। জল প্রসারিত হয়ে যতখানি এলাকায় ব্যাপ্তি হয়ে থাকে, জলের সেই উপরিতলকে জাল বলে, জলের উপরিতলের বা জলের ফাঁক দিয়ে যেমন মাছেরা লাফ দিতে পারে কিংবা পারে না, তেমনি পার্থিব জাল ভেদ করেও জালের ভেতরের প্রাণীরা লাফ দিতে পারে কিংবা পারে না। ইন্দ্র যে মানসিক নিয়মের সুতোর জাল বিস্তার করেন সেই জাল ভেদ করে ব্যাক্তি মালিক আমিরাও ( মাছেরাও ) বেরোতে পারে কিংবা পারে না। জাল যে ফেলে তার পক্ষে শুভ ফলদায়ী হলেও যাদের উপর ফেলে তাদের সকলের পক্ষে শুভ হয় না, জেলে, ব্যাধ, মাকড়সা, গ্রামাধ্যক্ষ প্রভৃতি যেমন জাল নিয়ে জীবন কাটায় তেমনি ঐন্দ্রজালিক গুণসম্মন্ন - যে অস্বীকৃত নয়, নিন্দানীয়ও নয়। নিন্দনীয় হলে আর জালিক থাকে না, হয়ে যায় জালী কারবারের কারবারী জালিয়াত। ( জল > জাল > জালিক > কৈবর্ত = ধীবর। ব্যাধ, মাকড়সা, ঐন্দ্রজালিক, কপট, ধূর্ত, গ্রামসমূহাধ্যক্ষ )।

জলের রাজনীতি ও জল যুদ্ধ অনিবার্য প্রায়। যুদ্ধে প্রথম হতাহত হয় সত্য, ন্যায় ও মূল্যমান বা মূল্যবোধ। আমরা বারে বারে ঘুরে ফিরে জলেরই কথা বলব। আপাতত জলাঞ্জলি, তবে জলপিপিও তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসে।

Source: Published at Gopalpur, Sarkarpool, South 24 Parganas, Pin -700143.

Disqus Comment