আতঙ্ক

Submitted by Hindi on Mon, 03/27/2017 - 08:21
Printer Friendly, PDF & Email
Source
গোপালপুর কলম সোসাইটি পরিচালিত পাক্ষিক সংবাদপত্র ‘দুর্বার কলম’, ‘জল’ উত্সব সংখ্যা 2016

হঠাত্ই ট্রোনটা খুব জোরে ব্রেক কষে আর দাঁড়িয়ে পড়ে। জানালার বাইরে দেখা যায় আরো কিছু মানুষ হাতে বালতি আর বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রেনে উঠবে বলে। এই দলে বৃদ্ধ, মহিলা, পুরুষ, শিশু কেউই বাদ নেই বললেই চলে। ট্রেনে উঠেই মহিলারা শিশুদের বলে - তোরা ঐ দিকটায় চলে যা, তোমরা পাশের কামরায় চলে যাও। ভেতরে ঢুকেই নিঃসংকোচে সোজা ওরা চলে যায় রেলের কম্পার্টামেণ্টের টয়লেটে, সেখানে গিয়ে জলের ট্যাপ খুলে বোতল, বালতি, জগ ভর্তি করে নেয় জলে। শিশুরা হামাগুড়ি দিয়ে সিটের নীচে, আর বয়স্করা আপার বার্থের জলের উচিষ্ট বোতলগুলি ব্যাগে ভরতে থাকে কোনোরকম দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে। সবকিছু প্ল্যানে যেন নিখুঁত জারিজুরি আর মুন্সিয়ানার ছাপ। ওরা যেন এই কাজ করতে অভ্যস্ত। মহারাষ্ট্রে আহমেদগর থেকে দুরে বিশাল লোকালয় নিয়ে অবস্থিত বড়ো গ্রাম তিনটি। এই স্থানে রয়েছে বহু পেশায় যুক্ত মানুষজন। এছাড়া রয়েছে শ্রমিক, রিস্কা চালক, ভ্যান চালক, ভুটভুটি চালক আরো বহু কর্ম বৈচিত্রময় মানুষ। সকাল হবার সাথে সাথে সকলে দাঁত মেজে, চোখে মুখে জল দিয়ে বাড়িতে চা খেয়ে বা পাড়ার কোনো চায়ের দোকানে চা বিস্কুট, বা চা ঘুঘনি মুড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়ে যার যার নিজের কাজে। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যে হলে চাকরিজীবীদের সাথে অন্যান্য পেশাদারি মানুষও সাইকেল, ভ্যান বা রিক্সা বা ভুটভুটি করে গ্রামে ফিরে আসেন।

গ্রীষ্মকালে এখানকার তাপমাত্রার পারদ 48 থেকে 52 ডিগ্রীতে প্রায় পৌঁছে যায় তবু এখানকার মানুষ তাদের কাজ করে যায়, উপার্জন করে যায়। গাছগাছালি থাকা স্বত্ত্বেও এই অঞ্চলের গরমে কোনোবারেই তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। এখানকার সরপঞ্চ বা মুখিয়া তিনটি বড়ো গ্রামের হোতা ও নেতা - নেত্রীদের আহ্বান করে গ্রামের মধ্যবর্তী ক্রীড়া ময়দানে। বিশাল জনসভার আয়োজন করেন যা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে সংঘটিত হয়। এখানকার সরপঞ্জ দেবরাজ কাপুর সভার মাইকে চিত্কার করে বলেন – আমাকে বলুন, আমি আপনাদের কি দিই নি ? আমি এখানে কি করি না ?

আনাজ, জমি থেকে আরম্ভ করে পাট্টা, খতিয়ান পর্যন্ত করে দিয়েছি। আমি আরো করবো সবার জন্য, তবে একটু সময় প্রয়োজন আমাকে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন -আমি আপনাদের সব দিকে থেকে স্বাধীন করে দেব, কোনো খাজনা বা অর্থ আমাকে আর দিতে হবে না উপঢৌকন হিসেবে। এখানকার জলকষ্ট নিয়ে প্রবীন নেতা দিকপাল দেশরাজ বলেন - আমি তো দেখি এখানে জলকষ্ট, আপনারা যারা মহিলা আছেন তারা পনেরো কিমি পথ অতিক্রম করে কোমরে কলসি নিয়ে জল আনতে যান আমার খুব কষ্ট লাগে, বুকটা ফেটে যায় ব্যথায়। না, না, না আমি এ কষ্ট দেখতে পারবো না আপনাদের। আমাকে আপনারা ভোট দিন আমি আপনাদের জল দেব। আজকের এই বৃহত জনসভায় আমি অঙ্গীকার করছি যদি দু-বছরের মধ্যে জলের সঠিক বন্দোবস্ত আমি করে দিতে পারি তাহলে এই মোচ - দাড়ি কেটে ফেলবো। মাথাও ন্যাড়া করে দেব।

দেখতে দেখতে দু-বছর অতিক্রান্ত, হয়ে যায় কিন্তু আশ্বাস আশ্বাসই হয়ে থাকে। এভাবেই অতিবাহিত হতে থাকে এখানকার মানুষের জীবন। চারিদিকে খরা শুরু হয়ে যায়। জমি, কৃষিজমি সব শুকোতে আরম্ভ করে। মাঝে মাঝে বৃষ্টির জল মাটিতে পড়লে মাটি একটু ভিজে যায় এবং জলস্তর কিছুটা ওপরে উঠে আসে। দিলশান যব্বর নামে বি.ডি.ও অফিসার সেবার বর্ষা আসার পূর্বে এখানকার সব সরপঞ্জ বা মুখিয়াদের ডেকে অফিসের মিটিং হলে সভা করেন। তিনি বলেন - আপনাদের জন্য একটা দায়িত্ব এসেছে, জল সংরক্ষণের জন্য প্রত্যেক সরপঞ্জ বা মুখিয়াদের প্রত্যেক গ্রামে তিন - চারটি করে বড়ো জলাধার তৈরি করতে হবে।

জলাধারের জন্য যে টাকা - পয়সা, যন্ত্রপাতি জিনিসপত্রের দরকার এমনকি মিস্ত্রি, লেবার চার্জ তা সরকার বহন করবে। এই তৈরি করা জলাধারগুলিতে বর্ষাকালে জল সংরক্ষণ করা হবে বৃষ্টির জলকে ধরে রেখে। সরকারি উদ্যোগে প্রত্যেক গ্রামে জলাধারগুলি তৈরিও হয়। কিন্তু এই জলাধারের সংরক্ষণ করা জল দিয়ে আর কতলোক উপকৃত হবে ? তাই কিছু দিন মুষ্টিমেয় কিছু লোক উপকৃত হলেও তেমন কোনো ফল হয় না এই জল দিয়ে। দুই গ্রামের নতুন বি.ডি.ও অফিসার মাননীয় বি.কে. সিং এবং রাজ তালুকদার মানুষকে ডেকে বলেন - এখানকার সাধারণ টিউবওয়েল, ডিপ টিউবওয়েলগুলিও কাজ করছে না এই প্রচণ্ড খরা আর তাপপ্রবাহে, প্রতি বছর মানুষ এভাবেই কষ্টে দিন যাপন করে থাকে, তবে দেখি কিছু অন্য ব্যবস্থা করতে পারি নাকি। আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন।

এই তো কিছুদিন পূর্বের বিশিষ্ট সমাজসেবী ও মহিলা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী দেবী পান্ডে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কিছু জলভর্তি জার বিলি করেন, গ্রামেরই এক বৃদ্ধ ব্যক্তি নাম মানকুমার গোখলে যিনি পূর্বে এখানকার সরপঞ্জ ছিলেন, এগিয়ে আসেন দেবী পান্ডেকে দেখে। এসে বলেন -ম্যাডাম এই জল দিয়ে কি পাকাপাকি মানুষের তেষ্টা মোটানো যাবে ? আপনাদের উপরমহলে জানিয়ে যদি আমাদের পাকাপাকিভাবে জলের কোনো বন্দোবস্ত করে দিতে পারেন তাহলে বুঝবো যে কিছু করেছে আপনাদের প্রভুরা।

গ্রামের শিক্ষক ধৃতিমান শেঠ কলেজ পড়ুয়াদের সাথে নিয়ে উষসী দত্তা ও অনিশ বনসাল নামে দুই অধ্যাপকের সাথে গ্রামে গ্রামে গিয়ে জল সংগ্রহ ও জল সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা শিবিরে অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন প্রচেষ্টা, পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হয় এই অনুষ্ঠানগুলিতে। এখানকার লোক অতিষ্ট হয়ে যায় গরমে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, যাদের অবস্থা আশংকাজনক তারা রাতারাতি প্ল্যান করে পাঁচটি দলে ভাগ হয়ে যায় বাঁচতে। এরপর পরপর পাঁচটি স্টেশনে তারা পৌঁছে যায় হাতে বুলডুং জগ, বোতল অন্যান্য পাত্র নিয়ে। খবরের কাগজগুলিতেও হেডলাইন শুধু খরা, দাবদাহ, লু-এর কথা। এমতাবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছে স্টেশনগুলি থেকে ঐ তৃষ্ণার্ত লোকগুলি। ট্রেনে উঠে বলছে - দাদা আপনার জলের বোতলটা দিন না একটু জল খাবো। কারো কারো বোতলের জল তলায় গিয়ে ঠেকেছে তবু হাতছাড়া করতে চাইছে না ওরা জলের ঐ অবশিষ্টাংশ। আর তাই কাছে টেনে নিয়ে ঐ বোতলগুলি বড় ঝোলায় ভরছে তাড়াতাড়ি।

একজন লোক কথা শুনে মনে হলো কোনো ব্যংকের ম্যানেজার। তিনি বলেছেন - বুঝেছো ভাই প্রকাশ, ঐদিন নিউজ পেপার আমি পড়লাম প্রতি আত্মহত্যায় দশজনের মধ্যে সাতজনই কৃষক। পাঁচ বছরে ভয়ংকর খরায় আর বিদর্ভের কৃষকদের ভারী দুর্দশার মধ্যে দিন অতিবাহিত হয়েছে। প্রকাশ - হ্যাঁ বিষয়টা সত্যিই খুবই ভয়ানক। হঠাত্ই ট্রেনটা খুব জোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে। জানালার বাইরে দেখা যায় আরো কিছু মানুষ হাতে বালতি আর বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রেনে উঠবে বলে। এই দলে বৃদ্ধ, মহিলা, পুরুষ, শিশু কেউই বাদ নেই। ট্রেনে উঠেই মহিলারা শিশুদের বলে - তোরা ঐ দিকটায় চলে যা, তোমরা পাশের কামরায় চলে যাও। ভেতরে ঢুকেই নিঃসংকোচে সোজা ওরা চলে যায় রেলের কম্পার্টামেণ্টের টয়লেটে, সেখানে গিয়ে জলের ট্যাপ খুলে বোতল, বালতি, জগ ভর্তি করে নেয় জলে। শিশুরা হামাগুড়ি দিয়ে সিটের নীচে, আর বয়স্করা আপার বার্থের জলের উচিষ্ট বোতলগুলি ব্যাগে ভরতে থাকে কোনোরকম দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে।

সবকিছু প্ল্যানে যেন নিখুঁত জারিজুরি আর মুন্সিয়ানার ছাপ। ওরা যেন এই কাজ করতে অভ্যস্ত। কয়েকজন বৃদ্ধ আর মহিলার কোলে বাচ্চা (শিশু) ছিল। এদের মধ্যে দুজন শিশুর হাতে নামমাত্র জল অবশিষ্ট। একটি একটি করে দুটি বোতল তুলে দিতেই ঐ শিশু দুটির একগাল চওড়া হাসি বেরিয়ে এলো। তা যেন এই জগতে সত্যিই অবিনাশি। সঙ্গে সঙ্গে দুজন পুলিশ অফিসার ট্রেনে ঢুকে জোরে বাঁশি ফুঁকলো। এক মিরাকেল ঘটলো - শিশু, বৃদ্ধ, পুরুষ, মহিলারা সব তাড়াহুড়ো করে ট্রেন থেকে নেমে পড়তে লাগলো। তো কেউ ঝাঁপ দিলো। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে ওদের জলের পাত্রগুলি থেকে এতটুকু জল বা এক ফোঁটা জলও নীচে পড়লো না। এমন সময় টি.টি বিশ্বম্ভর পুরী পরিবেশ শান্ত করে। পুলিশ অনুরোধ পান্ডেকে বললেন - এটাই এখন হচ্ছে ওদের বাস্তব। পুরুষরা আগের স্টেশনগুলি থেকে ট্রেনে উঠে পড়ে পাত্র নিয়ে, সুযোগ পেলে চালাকি করে, ট্রেনের চেন টেনে ট্রেন থামিয়ে দেন এভাবে। তারপর টয়লেটে ঢুকে জল পাত্রে ভরে নিয়ে চম্পট দেয়।

এভাবে সেই জলেই কোন ক্রমে আবার একদিন খরার সাথে লড়াই করে ওরা বেঁচে থাকে। এটাই হচ্ছে ওদের প্রতিদিনকার রুটিন, কাজের হিসেব। কারণ গ্রামগুলির এই মানুষগুলি ঠিক এভাবেই বেঁচে থাকে বর্ষা না আসা অবধি, কোন সময় হয় তো বর্ষারও দেখা পাওয়া যায় না খরার প্রকোপে সকল কৃষক, মানুষ, চাষি ‘আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে...’ বলে চিত্কার করে বুকে ফেটে কাঁদে - কিন্তু পানীয় ব্যবহার্য জলের সু-পাকা বন্দোবস্ত করে দিতে সবাই অক্ষম হয়। প্রকৃতির নিষ্টুরতায় মানুষ জলের জন্য হাহুতাশ করে আর এভাবেই দিন যাপন করতে থাকে। উপরওয়ালা, প্রশাসন, সরকারের দিকে তীর্থের কাক হয়ে বসে থাকে। আর অধীর চিত্তে দিন গোণে কবে তারা এই সংকট আর আকঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে। আর ভাবে তারা কবে স্নিগ্ধ দিন কাটাতে পারবে সুস্থতায় সকল সনাতন আর সুপ্রকৃতিকে সঙ্গী করে।

Source: Published at Gopalpur, Sarkarpool, South 24 Parganas, Pin -700143.

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा