কাবেরীঃ বিবাদের সমাধান হবে

Submitted by Hindi on Thu, 05/11/2017 - 15:32

আজ কোথাও জল কম পড়লে সেখানে ঝরে পড়া বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিবর্তে অন্য জায়গা থেকে বয়ে আসা নদীজলের অধিকার নিয়ে মারামারি করাই বেশি কাজের হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কাবেরী-বিবাদে সামিল এলাকাগুলো যদি এই লড়াই ঝগড়া করতে করতেও নিজের নিজের এলাকায় বৃষ্টিজল সংরক্ষণের প্রাচীন জানা কাজ চালিয়ে যেত, তাহলে হয়ত দেখা যেত বিবাদ শেষ হবার আগেই তাদের জলের সমস্যা মিটে গিয়েছে।

এ দেশের কোটি কোটি মানুষ নিত্যদিন প্রাতঃস্নানের সময়ে বা কোন শুভকাজের শুরুতে যে সাতটি নদীকে স্মরণ করেন তার মধ্যে কাবেরীর নাম আসে। এভাবে সমগ্রদেশের আপন বলে মানিত এই নদী আজ বিশেষভাবে দুটি রাজ্যের ‘তোর নদী না মোর নদী’ বিবাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধ প্রধানত তামিলনাডু আর কর্ণাটকের মধ্যে হলেও অন্য কিছু এলাকা, যেমন কেরল ও পুদুচ্চেরিও এই জলের দাবিদার। মোটের ওপর নদী একটিই। তাতে বয়ে যাওয়া জলের পরিমাণ প্রচুর না স্বল্প, সে হিসেব করবেন তাঁরা, যাঁরা সেই জলের দিকে লোভের নজর মেলে হিসেব লাগাচ্ছেন যে কী উপায়ে বেশিরভাগ জল তাদের খেতে সেচের কাজে লাগানো যাবে।

সতের বছর ধরে চলতে থাকা এই বিবাদ যখন পঞ্চাটে ফয়সালা হল তখন অনেকেই আশা করেছিলেন যে এবার একটা সমাধানে পৌঁছনো যাবে। কিন্তু দেখা গেল সে সমাধান নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। ঘোষণার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একপক্ষের সন্তোষ ও অন্যদের ক্ষোভ প্রকাশ্য রাস্তায় নেমে এল।কাজেই, সতের বছর প্রতীক্ষার পর আসা সমাধান কেবল একটা দম নেবার সময় মাত্রই হয়ে দাঁড়াল। স্থায়ী কোন সমাধান আসতে যে আরো কতদিন লাগবে, সে কথা কেউই বলতে পারে না।

কর্ণাটক আর তামিলনাডু- দুটি রাজ্যই আমাদের দেশে জলসমৃদ্ধ বলে সমধিক পরিচিত। ভারতের দক্ষিণাংশেও কিছুজন কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঠিকই কিন্তু এরকম দুর্ভাগ্যের কবল থেকে এই রাজ্যদুটি এখনো মুক্ত আছে। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু কিছু অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করলে আলোচ্য জায়গাগুলোর অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। অথচ গত বিশ বছরে নদীজল নিয়ে এই দুই রাজ্যের বিবাদ এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যাতে মনে হতে পারে যে এদের প্রতিটি ক্ষেতে নিশ্চয়ই এই নদীটিই সেচের জল দিত।

বাস্তবে কিন্তু তা ছিল না। ব্রহ্মগিরিতে উৎপন্ন এই কাবেরী নদী, ইংরেজ আমলে বা তারপরেও এর থেকে কাটা কয়েকটি খাল দুই রাজ্যেরই মাত্র সামান্য অংশের কিছু ক্ষেতে সেচ দিত। উভয় এলাকারই অনেকখানি বড় অঞ্চল আছে যেখানে এইসব সেচখালের জল কোনদিনই পৌঁছবে না। সুতরাং বলাই যায় যে জলের জন্য এই তৃষ্ণা প্রকৃতপক্ষে চাষের ক্ষেত থেকে রাজনীতির শুকিয়ে ওঠা গলা ভেজানোর জন্যই বাড়ানো হচ্ছে।

আলোচ্য দুটি রাজ্যেরই রয়েছে জল সংরক্ষণের প্রাচীন ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের প্রসাদে বৃষ্টিতে ঝরে পড়া সমস্ত জলটাই সুন্দরভাবে রক্ষিত হত। এড়ি, চেরি, পুকুর, কুন্ড- বৃষ্টির জল ধরে রাখার এইসব জলাধার তোইরি হত অগণন। হাজার হাজার লোক এগুলির যত্ন নিতেন, লক্ষ লক্ষ কৃষক চিরকাল নিজেদের জ্ঞানে সংগৃহীত সেই জলের ওপর নির্ভর করেই ক্ষেতে প্রচুর ফসল ফলিয়েছেন। গত কিছু বছরে এসব জল সংরক্ষণ ব্যবস্থার বেশ কিছু নষ্ট করা হয়েছে কিন্তু তার জায়গায় কোন স্বাভাবিক বিকল্প তৈরি হয় নি। কাবেরী-বিরোধে একটা ছোট অংশ পুদিচ্চেরিরও আছে। এই স্থাননামটির অর্থই হল ‘নতুন পুকুর’। কি করে এরকম নাম হতে পারে কোন জায়গার? কোনকালে হয়ত এই জায়গায় জলের সুবন্দোবস্ত ছিল যা পরে কিছু নষ্ট হয়ে বা কম পড়ে থাকবে। তখন আবার নতুন করে জলের কাজ অর্থাৎ পুকুর তৈরি হয়েছিল যেই খুসিকে স্মরণীয় করে রাখতে জায়গার নাম হয় পুদুচ্চেরি। সেই নামই এই জায়গার প্রাচীন পরিচয় মনে করিয়ে দেয়।

আজ কোথাও জল কম পড়লে সেখানে ঝরে পড়া বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিবর্তে অন্য জায়গা থেকে বয়ে আসা নদীজলের অধিকার নিয়ে মারামারি করাই বেশি কাজের হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কাবেরী-বিবাদে সামিল এলাকাগুলো যদি এই লড়াই ঝগড়া করতে করতেও নিজের নিজের এলাকায় বৃষ্টিজল সংরক্ষণের প্রাচীন জানা কাজ চালিয়ে যেত, তাহলে হয়ত দেখা যেত বিবাদ শেষ হবার আগেই তাদের জলের সমস্যা মিটে গিয়েছে।

এই বিরোধের সময়েই আমাদের খেয়াল করে নিতে হবে যে এসব বিবাদের মীমাংসা করা এখনও সম্ভব হয়নি। এদেশের একটি রাজ্যের নাম সেখান দিয়ে বয়ে যাওয়া পাঁচটি নদীর সম্মানে- পাঞ্জাব। এখানে জলের অভাব কখনো ছিল না। কিন্তু সেই পাঞ্জাবও আজ নিজের দুই প্রতিবেশী রাজ্য হরিয়ানা ও রাজস্থানকে জলের ভাগ দিতে আপত্তি জানাচ্ছে। নর্মদার জল নিয়ে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের দ্বন্দ্ব আজ বিশ্বময় প্রচারিত। যমুনা নদীর জল নিয়ে রাজধানী দিল্লি, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের ঝগড়া এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তালিকা দীর্ঘ করতে চাইলে, ভয় হয়, তা কোন এক নদীর মতই লম্বা-চওড়া হয়ে দাঁড়াবে। দেখা যাবে তাতে কেবল ান্তঃরাজ্য নয়, একই রাজ্যের মধ্যে জেলায় জেলায় পর্যন্ত নদীর জল নিয়ে বিরোধ বেধে আছে।

অনেকের মত হল এসব রোগের একটি মাত্র দাওয়াই আছে- জাতীয়করণ। তাঁরা খেয়াল করেন না যে নদী হোক বা অন্য কিছু, জাতীয়করণও পুরোন চিকিৎসা।নদীদের জাতীয়করণ হবার পরও যদি দেখা যায় যে এই সমস্যা মিটল না, রাজ্যে রাজ্যে নদীজল নিয়ে বিরোধ লেগেই থাকছে, তখন বলা হবে প্রাইভেটাইজেশানের কথা। দুশ্চিন্তা এই যে এই উভয় চিকিৎসাই রোগের চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক ও ক্ষতিকর হতে পারে।

তার চেয়ে ভালো যদি আমরা নিজের নিজের এলাকায় প্রচলিত প্রাচীন বৃষ্টিজল রক্ষণের উপায়গুলো যত্ন করে খুঁজে বার করে সেগুলো আবার কাজে লাগানোর চেষ্টা করি।সেইভাবে তৈরি হওয়া জলাশয়গুলোকে যেন অকাজের পুরোন আবর্জনা না ভাবি। এগুলো এমনকি আমাদের নতুন প্রযুক্তির টিউবওয়েলেও জল এনে দিতে পারবে। রাজনীতির মতই ভূজলও দ্রুত নিচে নেমে গেছে। তাকে ওপরে তুলে আনা কোন রাজনৈতিক নেতার সাধ্য নয়। কিন্তু যদি এলাকার সাধারণ মানুষরা চান, বৃষ্টির জল আটকে হাজার হাজার টিউবওয়েলকে তাঁরা আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারেন। কোন ক্ষেতে সেচ দেবার জন্য তখন আর দূর থেকে বয়ে আসা কাবেরীর জলের প্রয়োজন থাকবে না। সেই সঙ্গে সময় থাকতে থাকতে নিজেদের ক্ষেতগুলোকে সেই সব ফসল থেকে মুক্ত করে নেওয়া ভালো যারা অনেক বেশি জল চায়।নাহলে কাবেরীর পুরো জল যদি একটিমাত্র রাজ্যকেও দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও যথেষ্ট হবে না। নিকটতম প্রতিবেশী শত্রু হয়ে উঠবে। আজকের অবস্থায় কাবেরীর ২৭০টিএমসি ফুট জল পেয়ে কর্ণাটক ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। সেটা দাবি মত ৪৬৫ টিএমসি ফুট হলে কর্ণাটক খুশি হত। তামিলনাডু খুশি হবে নিজের দাবিমত ৫৬২ টিএমসি ফুট জল পেলে। অর্থাৎ কাবেরীতে যা জল আছে তাতে এই দুই রাজ্যের মনান্তর মিটবে না।

এদেশের এক বৃহৎ অংশ জলের সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছে। বি নিমন্রণে, কোন সরকারি ভাতার তোয়াক্কা না করে দেশের এককোটির বেশি মানুষ কুম্ভস্নানে যান। দেশের প্রাচীন ও লোকমান্য জলসংস্কৃতির এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে! অথচ জলের প্রতি এমন শ্রদ্ধাশীল, জলজ্ঞানী মানুষরাও আজ রাজনীতির নীচতার কারণে জলের দাবিতে বয়ে যাচ্ছেন। নদীকে তাঁরা মায়ের বদলে দাসীর ভূমিকায় দেখতে চান। ক্ষেতে সেচের কাজ ঠিকমত না পেলে রাস্তায় নেমে আসেন।

Disqus Comment