আক্রান্ত জলাভূমি

Submitted by Hindi on Mon, 07/03/2017 - 10:33
Source
দ্বি-মাসিক পত্রিকা, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী – (মে – জুন সংখ্যা) ১৯৯১।

1918 সালে বিদ্যাধরীকে বাঁচানোর প্রথম ও শেষ চেষ্টা শুরু হল। নদীর বুক থেকে পলি তুলে গভীরতা বাড়ানর চেষ্টা চলল লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে। কিন্তু ততদিন বোধ হয় বড্ডো দেরী হয়ে গেছে। 1928 সালে সরকারীভাবে বিদ্যাধরীকে “মৃত” বলে ঘোষণা করা হল। সাগরের জল চোকা বদ্ধ হল - লবণহ্রদ থাকল শুধু নামেই নোনা। এই লেখাটি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান কর্মীর সম্পাদক মণ্ডলীর যৌথ প্রয়াসের ফসল। অনেকগুলি সংস্থার বন্ধুদের সাহায্যে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরী হয়েছে একটি বুকলেট – আক্রান্ত জলাভূমি। আমরা সেই বুকলেটের রসদ কেটে-ছেঁটে পত্রিকার মাপে করে নিয়েছি – সঃ মঃ

পূর্ব কলকাতায় জলাভূমি ছিল – এখনও আছে!

এখন থেকে পঁচাত্তর বছর আগে কলকাতায় বেলেঘাটা থেকে বেলগাছিয়া অবধি যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে পূব দিকে তাকালে চোখে পড়ত বিশাল এক জলাভূমি – পুব, দিক্ষণ - পুব আর উত্তর - পুব জুড়ে। এখন সে জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা যাবে কেবল সারি সারি ঘরবাড়ী। বেলগাছিয়া, পাতিপুকুর, শ্রী ভূমি, লেক টাউন, বাঙ্গুর জুড়ে। তৈরী হয়েছে উঁচু ভি আই পি রোড। তারপরে আজকের বিধান নগর বা সল্ট লেক। এই বিধান নগরের শেষ সীমানায় তৈরী হয়েছে সাড়া জাগানো শিশু উদ্যান ঝিলমিল বা নিকো পার্ক। এই নিকো পার্কের প্রান্তে এসে দাঁড়ালে চোখে পড়বে সেই বিশাল জলাশয়ের পড়ে থাকা অংশ। পুরনো লবণ হ্রদ। যে জলাশয়কে এখন গ্রাস করতে উদ্যত শহর কলকাতা। তাই নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়েছে। কেন এই হৈচৈ - জানতে, গিয়েছিলাম ওই এলাকাতে তার ভিত্তিতে রচিত এই প্রাথমিক প্রতিবেদন।

ঝিলমিল - নিকো পার্ক -এর গায়েই হল নলবন ভেড়ি। তারপর গায়ে গা লাগিয়ে ডান থেকে বাঁ দিকে সুকান্তনগর ভেড়ি, চার নম্বর ভেড়ি, সর্দার ভেড়ি, চকের ভেড়ি, নারকেলতলা ভেড়ি, চিন্তা সিং, মুন্সীর ভেড়ি, মোল্লের ভেড়ি। আর পরের লাইনে নাটার ভেড়ি, সাহেব মারা ভেড়ি, গোপেশ্বরের ছোট ও বড় ভেড়ি আর ছোট পরেশ ও বড় পরেশ ভেড়ি। এইভাবে দক্ষিণ - পূর্ব দিকে পরের পর ভেড়ি। এই পুরো অঞ্চলটাকেই আগে বলা হত লবণ হ্রদ - এখন বলে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। ভি আই পি রোডের পর থেকে এই জলাভূমির চার ভাগের এক ভাগ বুঝিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিধান - নগর বা সল্ট লেক মহানগরী।

একজন ভেড়ি শ্রমিকের সঙ্গে আলাপ হলে তিনি জানালেন, - ‘‘জানেন, এই জলাভূমিতে আমরা প্রায় আঠারো হাজার লোক বাস করি। কলকাতার বাবুরা অনেকেই এ খবর রাখেন না। তারা ভাবেন এ অঞ্চলটাতে কিছুই নেই - কেবল নোংরা আর নোনা জলের মজে যাওয়া কিছু খাল – বিল - ডোবা। অনেকে বলেন রোগের জীবাণু তৈরি করা আর মশার চাষ করা ছাড়া এই জায়গাটার আর কোনো কাজ নেই। বাবুদের মতে এ অঞ্চলটা মাটি ফেলে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।’’

সে অনেক – অনেক দিন আগেকার কথা


উত্তরে দমদম থেকে দক্ষিণে সোনারপুর পর্যন্ত অঞ্চলটাতে বহু কাল ধরেই এই লবণ হ্রদ আছে। 1704 সালে কলকাতার ওপর ইংরেজদের লেখা প্রথম বইতেও সে খবর পাওয়া যায়।

এর নোনা জল সমুদ্র থেকে মাতলা, পিয়ালি, বিদ্যাধরী নদী হয়ে এই অঞ্চলে এসে পৌঁছত। জোয়ারের সময়ে জলে ভরে উঠত লবণ হ্রদ - ভাঁটার টনে জল ফিরে যেত সাগরের দিকে। সারা অঞ্চলে বিদ্যাধরী নদীর অনেকগুলো শাখা ছিল। এগুলোতে জলও থাকত সারা বছর। কলকাতা থেকে সুন্দরবন এমন কি যশোর, খুলনা যাতায়াত করত বণিকেরা এই লবণ হ্রদের মধ্যেকার নদী পথ দিয়েই।

সমুদ্রের নোনা জল লবণ হ্রদে বয়ে নিয়ে আসত নানা ধরনের মাছ যেমন - গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি, কুচো চিংড়ি, পারশে, ভাঙ্গার, ভেটকি, গুরজাওলি ইত্যাদি। এ অঞ্চলের মানুষ ছোট - ছোট বাঁধ দিতে শুরু করলেন লবণ হ্রদের বিভিন্ন অংশে। তার ফলে জোয়ারের জল মাছ-সমেত ঢুকে পড়ত নোনা ভেড়িগুলোতে। কিন্তু ভাটার টানে অনেকটা জল বেরিয়ে গেলেও মাছগুলো আটকা পড়ে যেত ভেড়ির অল্প জলেই। এ অঞ্চলে মাছ চাষ মোটামুটি এ ভাবেই শুরু হয়।

লবণহ্রদে নোনা জল আসা বন্ধ হল


প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী জোয়ার - ভাঁটার তালে তালে বিদ্যাধরী হয়ে লবণ হ্রদে নোনা জলের যাতায়াত চলছিল। বাদ সাধল মানুষ আর কলকাতা শহরের ফুলে ফেঁপে ওঠা।

কলকাতা শহরের তিন পাশ ঘিরে যে সমস্ত নিকাশী খাল দেখতে পাওয়া যায় সবই তৈরী হয়েছে স্বাধীনতাপূর্ব কালে। যেমন টালির নাবা 1775 সালে, বেলেঘাটা খাল 1810 সালে, সার্কুলার খাল 1830 সালে এবং সর্ব শেষ কেষ্টপুর খাল 1910 সালে। একটা খাল বুজিয়ে রাস্তা হয়েছে - সেটা হল সার্কুলার রোড।

সেই 1875 সাল থেকেই কলকাতা শহরের বৃষ্টির জল আর নোংরা জল হুগলী নদীতে ফেলা হত না - ফেলা হত বিদ্যাধরীরতে। ভাঁটার টানে বিদ্যাধরীই তা টেনে নিয়ে যেত সাগরে। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এ ব্যবস্থা ঠিকঠাক চলেছিল। তারপরই দেখা দিল বিপদ। জোয়ারের সাথে সাগর থেকে বয়ে আনা পলি আর শহরের নোংরা জলে মিশে থাকা ময়লা জমতে থাকল বিদ্যাধরীর বুকে। নদীর গভীরতা কমতে থাকল।

1918 সালে বিদ্যাধরীকে বাঁচানোর প্রথম ও শেষ চেষ্টা শুরু হল। নদীর বুক থেকে পলি তুলে গভীরতা বাড়ানর চেষ্টা চলল লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে। কিন্তু ততদিন বোধ হয় বড্ডো দেরী হয়ে গেছে। 1928 সালে সরকারীভাবে বিদ্যাধরীকে “মৃত” বলে ঘোষণা করা হল। সাগরের জল চোকা বদ্ধ হল - লবণহ্রদ থাকল শুধু নামেই নোনা।

বিদ্যাধরী বুঁজে যাওয়ার পর প্রযুক্তিবিদ বি এন দে মহাশয়ের পরিকল্পনা মত কলকাতার ময়লা জল 28 কিলোমিটার দীর্ঘ একজোড়া নতুন কাটা খাল মারফত কুলটি নদীতে নিয়ে ফেলা হচ্ছে।

Disqus Comment

More From Author

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा