বিজ্ঞাপনে পরিবেশ

Submitted by Hindi on Mon, 07/03/2017 - 11:25
Printer Friendly, PDF & Email
Source
দ্বি-মাসিক পত্রিকা, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী – (মার্চ – জুন সংখ্যা) ১৯৯২।

কিছু পরিবেশ প্রেমী মানুষ প্রতিবাদে সরব হয় উঠলেন আমেরিকাতে। সানফ্রান্সিক্যের প্যাসিফিক গ্যাস এ্যান্ড ইলেকট্রিক কোম্পানী কালিফোর্নিয়ার উপকূলে একটি প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন বলে। প্রতিবাদের পাল্টা জবাব দিলেন কোম্পানী। চারটি রঙে রঞ্জিত বিশাল বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলো কোম্পানীর তরফে। বড় বড় হরফে সেই বিজ্ঞাপনে লেখা – মা প্রকৃতির মুখে হাসি ফোটাই আমরা। অথচ ঐ কোম্পানী বসাতে এসেছেন একটি পরমাণু চুল্লী! অনেক দরিদ্র, সরল বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ প্রতারিত হয়ে থাকেন পঞ্জিকাতে প্রকাশিত কিছু বিজ্ঞাপন থেকে। লুধিয়ানা জলন্ধর দিল্লী কোলকাতা কোথায় নেই এই সব বিজ্ঞাপনদাতার। এদের সওদা হচ্ছে মন্ত্রপূত আংটি, সম্মোহনী রুমাল, আজব আয়না, স্বপ্নলব্ধ ঔষধপূর্ণ কবচ, সব তরংগের বেতার গ্রাহক যন্ত্র, এমন কি টেলিভিশন। এই সব জিনিসগুলি অমিত শক্তিধর এবং কার্যকরী বলে দাবি করা হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের পক্ষ থেকে। পঞ্জিকার খসখসে পাতা থেকে গ্রহ নক্ষত্র তিথি - লগ্নের সান্নিধ্য এড়িয়ে এ জাতীয় বিজ্ঞাপনগুলি চলে আসছে নামি দামি পত্র পত্রিকার ঝকমকে অংগের ভূষণ হয়ে। অবশ্য বহিরঙ্গে বিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চরিত্রে নয়। বিজ্ঞাপন দাতার নাম ও পণ্য দ্রব্যের পরিবর্তন হয়েছ। স্বভাবে নয়। পরিবেশ সচেতনতা যতই বাড়ছে ততই গলাবাজি বাড়ছে এদের। অশ্লীল সাহিত্যকে আমরা আখ্যা দিয়ে থাকি পণ্যে -সাহিত্য। এদের এই সব বিজ্ঞাপন - গুলিকে পণ্যে – পরিবেশ চিন্তার উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি। ভূমিকা আর নয়। কিছু নজির দেখা যাক।

কিছু পরিবেশ প্রেমী মানুষ প্রতিবাদে সরব হয় উঠলেন আমেরিকাতে। সানফ্রান্সিক্যের প্যাসিফিক গ্যাস এ্যান্ড ইলেকট্রিক কোম্পানী কালিফোর্নিয়ার উপকূলে একটি প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন বলে। প্রতিবাদের পাল্টা জবাব দিলেন কোম্পানী। চারটি রঙে রঞ্জিত বিশাল বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলো কোম্পানীর তরফে। বড় বড় হরফে সেই বিজ্ঞাপনে লেখা – মা প্রকৃতির মুখে হাসি ফোটাই আমরা। অথচ ঐ কোম্পানী বসাতে এসেছেন একটি পরমাণু চুল্লী!

মার্কিন মুল্লুক কেন? আমাদের এখানকার নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন প্রচারিত বিজ্ঞাপনের শিরোনাম এই রকম - ‘‘পরিবেশ সচেতন দেশগুলি কেন পরমাণু শক্তির দিকে ঝুঁকছে?’’ এর উত্তর বলা হচ্ছে অনেক কথা। দাবী করা হচ্ছে – ‘‘পরমাণু শক্তি পরিবেশ প্রশ্নে পরিচ্ছন্ন।’’ বলা হচ্ছে – ‘‘অন্যান্য বাণিজ্যিক শক্তি উত্পাদনের উত্সবে তুলনায় এটির পরিবেশের উপর প্রভাব সামান্যতম। এতে এ্যাসিড বৃষ্টি হয় না। সালফার ডাই - অক্সাইড, কার্বন ডাই - অক্সাইড বা নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত হয় না। চুল্লী বসাতে লাগে সামান্য জায়গা। স্থানীয় মনুষদের পুনর্বাসন করতে হয় কমই।’’

রাসায়নিক আর উচ্চ ফলনশীল বীজ, সেচের জল আর কীটনাশক নিয়ে ‘সবুজ বিপ্লব।’ অভিজ্ঞতা বলছে ধূসর বিপ্লব। যাই হোক কীটনাশক প্রস্তুত করার অন্যতম প্রতিষ্ঠান বেয়ার। এই বিদেশী প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপনে বলেছেন – ‘‘বেয়ার ইন্ডিয়া আরো ভাল পরিবেশের জন্য দায়বদ্ধ। পরিবেশ - দূষণ নিয়ন্ত্রনের যন্ত্রপাতি ছাড়লেন স্বদেশী - বিদেশী পুঁজিপকিরা। দূষণ না থাকলে এঁদের যন্ত্রপাতির বাজার যাবে হারিয়ে।” ছেড়েই দিচ্ছি আমেরিকার থ্রী - মাইলস আইল্যাণ্ড বা সাবেক সোভিয়েত রুশিয়ার চেরনোবিলের কথা। আমাদের ঘরের রাজস্থান এ্যাটমিক পাওয়ার প্লাণ্ট কি বলছে? বিগত কয়েক বত্সরে সেখানে সংলগ্ন জনপদগুলিতে চর্মরোগ ক্যানসার আর লিউকোমিয়াতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে কেন?

স্টীল অথরিটি অব ইণ্ডিয়ার বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে একটি দ্বিখণ্ডিত ফল, বহিরঙ্গে আপেল। বোঁটা আছে তার। আর অভ্যন্তরে দেখা যাচ্ছে কমলা লেবুর কোয়া। লেখা রয়েছে ‘‘আপেলও নয় লেবুও নয়।’’ তারই নীচে লেখা – ‘‘অন্যের মাপকাঠির ষ্টীল অথিরিটি অফ ইন্ডয়াকে আপনি বিচার করতে পারেন না।’’ এত বাক্য বিন্যাস! অথচ এদের দূর্গাপুরের ইস্পাত কারখানা থেকে প্রতিদিন কয়েক শো টন লাল কালো সাদা ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। লাল নাইট্রোজেন অক্সাইড আর কালো কার্বন ধোঁয়ার চারিদিক সর্বদা ভরে আছে।

একটা বিজ্ঞাপনে দেখছি ছোট্ট এক বালিকা দুটি কানে হাত চাপা দিয়েছে। ছবিতে শিশুর আঁকা বাঁকা কানে হাত চাপা দিয়েছে। ছবিতে শিশুর আঁকা বাঁকা হাতে লেখা – ‘‘শব্দ দূষণ বন্ধ করুন।’’ ভাল কথা। পটভূমিকাতে দেখছি একটি চলন্ত বাস। বেসরকারী বাস। বাঘের মুন্ডু মার্কা নয় সেটি। পরোক্ষ নিচূ গলায় বলা হচ্ছে না কি যে সরকারী বাসগুলি শব্দ - দূষণের কারণ নয়? এ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

কর্ণাটকের কাইগাতে প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও বসছে পরমাণু চুল্লী। পেট্রো-কেমিক্যাল ও সার কারখানার বিষে জর্জরিত বোম্বাই শহরের চেম্বুর নতুন খেতাব পেয়েছে গ্যাস চেম্বুর। মূল শহর থেকে কিছু সরে গিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে নিউ বম্বে। সিটি এ্যান্ড ইনডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেণ্ট কর্পোরেশন অফ মহারাষ্ট্র বিজ্ঞাপন দিয়েছেন এই নিউ বম্বের। বিজ্ঞাপন ভেসে যাচ্ছে বৃক্ষ প্রেম তথা পরিবেশ প্রেমে। বৃক্ষের নামে হচ্ছে রাস্তাগুলির নাম। নিম, তাল, পিপুল গুলমোহর। হ্যাঁ জামরুল আর আমড়াও আছে।

‘‘পরিবেশ আমাদের অমূল্য উত্তরাধিকার। আসুন সবাই মিলে পরিবেশ সংরক্ষণ করি। শুধু আজকের নয় অনাগত ভবিষ্যতকেও সুন্দর করে তুলতে।’’ বিজ্ঞাপনে দিয়েছেন এসব কথা ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন। বেসরকারী মুনাফালোভী এই প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিকালের কান্ডকারখানা তো সবাই জানেন। বজবজের পূজালি গ্রামের কথা বলছি।

রাসায়নিক আর উচ্চ ফলনশীল বীজ, সেচের জল আর কীটনাশক নিয়ে ‘সবুজ বিপ্লব।’ অভিজ্ঞতা বলছে ধূসর বিপ্লব। যাই হোক কীটনাশক প্রস্তুত করার অন্যতম প্রতিষ্ঠান বেয়ার। এই বিদেশী প্রতিষ্ঠান তাদের বিজ্ঞাপনে বলেছেন – ‘‘বেয়ার ইন্ডিয়া আরো ভাল পরিবেশের জন্য দায়বদ্ধ।’’

পরিবেশ - দূষণ নিয়ন্ত্রনের যন্ত্রপাতি ছাড়লেন স্বদেশী - বিদেশী পুঁজিপকিরা। দূষণ না থাকলে এঁদের যন্ত্রপাতির বাজার যাবে হারিয়ে। তাই দূষণের প্রতি এঁদের গোপন প্রেম। সেটা প্রকাশ করা চলে না। তাই ‘‘ফ্ল্যাক্ট’’ বলেন – ‘‘শিশুদের জন্য কিছু করুন।’’ এই ব্যাকুল আবেদন জানাবার আগে দোহাই দেন এ্যারিষ্টটল ডারউইন আর ডেভিড এ্যাটেনবরোর। বিজ্ঞাপনের একটি মুখ – নিষ্পাপ শিশুর।

মাদ্রাজের লক - এয়ার এ. জি. ইঞ্জিনিয়ার্স প্রাইভেট লিমিটেড বিজ্ঞাপন দিয়েছেন এক অশ্রূত পূর্ব যন্ত্রের। দরজা খোলা, তবুও - ‘‘ধুলো ঢুকবে না, তাপ ঢুকবে না, পেকা - মাকড় ঢুকবে না – ঢুকবে না কোনো দূষক পদার্থ।’’ বাতাসের পর্দা সব আটকে দেবে। আর ঘরে সজীবতাকে রাখাবে তালাবন্ধ করে। মূল্য মাত্র 5500 টাকা। আর লেখা আছে নকল হইতে সাবধান।

সামাজিক বনসৃজনের হাঁকডাক কমছে। বাজারে এসেছে বাণিজ্যিক বনসৃজন। লোভনীয় বিজ্ঞাপন আসছে। ষ্টার্লিংট্রী ম্যাগনাম (ইন্ডিয়া) লিমিটেডের প্রতীক চিহ্নে লেখা রয়েছে – সামান্য বিনিয়োগ বিশাল লাভ। মাদ্রাজের এই প্রতিষ্ঠানের কাজ সেগুন গাছের চাষ। এদের প্রতিশ্রূতি 20 বছরের জন্য 975 টাকা বিনিয়োগ করলে পাওয়া যাবে 62,000 টাকা।

এদের গোত্রের কোম্পানী ওকারা প্লানটেনশান। তাদের বিজ্ঞাপনে লেখা আছে – আমাদের অসাধারণ সেগুন গাছে আপনার টাকা 150 গুণ বাড়িয়ে তুললেন। (আর আপনার বিনিয়োগ 5 বছর পর ফেরত যোগ্য।) তাঁদের দাবী – এ যাবত কাল মানুষের উদ্ভাবিত সবচেয়ে চমকপ্রদ বিনিয়োগ পরিকল্পনা।

আমাদের সরকারী সঞ্চয় প্রকল্পগুলি এই সবুজ পুঞ্জিবাদির ধাক্কা সামলাতে পারবে কি? নমুনাগুলি থেকে বেশ বোঝা যাচ্ছে সরকারী আধা – সরকারী, বেসরকারী, বিদেশী সব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ নিয়ে খুব চিন্তিত। সেই চিন্তার প্রতিফলনে বিজ্ঞাপনের এত বহর। যেন মুনাফা নয় পরিবেশ রক্ষা তাঁদের প্রথম কথা। উত্তম কথা। কিন্তু আঁশের গন্ধে ধ্যান ভেঙে যায় যে অনেক গৃহপালিত তপস্বীর। তাই গৃহস্থকে সাবধান হতেই হয়।

Add new comment

This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

6 + 4 =
Solve this simple math problem and enter the result. E.g. for 1+3, enter 4.

More From Author

Related Articles (Topic wise)

Related Articles (District wise)

About the author

नया ताजा