জলাভূমির মুখোমুখি

Submitted by Hindi on Mon, 07/03/2017 - 11:54
Source
দ্বি-মাসিক পত্রিকা, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী – (মে – জুন সংখ্যা) ১৯৯১।

তবে কথাবার্তা বলে একটু ভিন্ন প্রকৃতির - মানুষ বলেই মনে হল। সব চেয়ে লক্ষণীয় এঁদের নিজেদের ওপর আস্থা। কোনরকম বাইরের সহায়তা ছাড়াই দিব্যি কেমন ময়লা জলে সবজী ও মাছ - চাষের ব্যবস্থা গড়ে তুলে দিন গুজরান করছেন। এজন্য এঁদের গর্বের অন্ত নেই। এথচ এমন স্বনির্ভর হাজার তিরিশেক মানুষের একটি জনগোষ্ঠীকে উত্খাত করার অপচেষ্টা চলেছে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির ভরাট করে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র হবে, তৈরী হবে বড় বড় আবাসন — এমন সব খবর প্রায়ই প্রচারিত হচ্ছে খবরের কাগজে। এ কথাও প্রচারিত হচ্ছে যে এর ফলে কলকাতার ময়লা জল পরিশোধনের ব্যবস্থা বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং এই উন্নয়ন প্রকল্পের ধাক্কার আবার ভিটে - মাটি জীবিকা হারাবেন বেশ কয়েক হাজার মানুষ। এ নিয়ে আমাদের অনেকেরই মনে নানান প্রশ্ন জমা হচ্ছিল। সেজন্য বেশ কয়েকদিন আমরা দল বেঁধে গিয়েছিলাম ওই ভেড়ী অঞ্চলটা দেখতে, লোকজনদের সাথে পরিচিত হতে এবং তাঁদের কথা শুনতে।

জায়গাটা কেমন


আদিগন্ত বিশাল জলাভূমি আর তাকে ঘিরে রয়েছে জলের মত সরু সরু খাল আর নালা। তারি মাঝে দ্বীপের মত জেগে আছে ছোট বড় অনেকগুলি গ্রাম। আর আছে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্বে উত্তর দিকে সল্টলেক উপনগরী। রাতের অন্ধকারে ভেড়ি এলাকা থেকে ঝলমলে আলোর মালায় সজ্জিত সল্টলেক শহর দেখতে ভালই লাগে। তবে এঁদের ঘরে জ্বলে কেরোসিন কুপি। বিদ্যুতের কথা ছেড়েই দিলাম - পানীয় জলের ব্যবস্থাটুকুও নেই। গোটা এলাকায় কয়েকটি টিউবওয়েল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে - ছিটিয়ে থাকলেও বেশীর ভাগই অকেজো। ‘স্যানিটেশন ব্যবস্থা’ বলে কিছুই নেই। একটা প্রাথমিক স্কুল চোখে পড়লেও এই বিশাল অঞ্চলের কোথাও কোন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র দেখিনি। ম্যালেরিয়া আর পেটের অসুখ এদের নিত্যসঙ্গী। আর সাপের কামড়ে মৃত্যু তো স্বাভাবিক ব্যাপার!

তবুও এখানে আছেন মানুষ। নিত্য দিনের সুখ দুঃখ দারিদ্র নিয়েই আছেন। তবে কথাবার্তা বলে একটু ভিন্ন প্রকৃতির - মানুষ বলেই মনে হল। সব চেয়ে লক্ষণীয় এঁদের নিজেদের ওপর আস্থা। কোনরকম বাইরের সহায়তা ছাড়াই দিব্যি কেমন ময়লা জলে সবজী ও মাছ-চাষের ব্যবস্থা গড়ে তুলে দিন গুজরান করছেন। এজন্য এঁদের গর্বের অন্ত নেই। এথচ এমন স্বনির্ভর হাজার তিরিশেক মানুষের একটি জনগোষ্ঠীকে উত্খাত করার অপচেষ্টা চলেছে।

জলাভূমির রাত্রি-দিনের কাব্য


মাঝ রাতে জেগে ওঠে ভেড়ি এলাকা। কাজে বেরিয়ে পড়ে মেয়ে পুরুষ রাত তিনটের মধ্যে ভেড়ির জলে নেমে হাতে হাতে জাল টানা চলে কোমর থেকে বুক জল অবধি ডুবে। ধরা পড়ল যে মাছেরা তাদের ভাগ্য. আড়তদারের কাঁটায় ওঠা। তবে কেউ কেউ রেহাই পেয়ে যায় সে যাত্রা ছোট বলে। এক দফা ঝাড়াই বাছাই করে অপেক্ষাকৃত ছোট মাছেদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় জলে, খেয়ে দেয়ে বড় হওয়ার জন্য। সাধারণতঃ খুব বেশী হলে একশ থেকে দেড়শ গ্রাম ওজন এবধি বাড়তে দেওয়া হয় এদের। বেশী বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করায় ঝামেলা অনেক। তাতে অনেকদিন আটকে থাকে টাকা। তার ওপর বড় মাছ খেয়ে ফেলে, আর চুরির ভয় তো আছেই। এজন্য পাহারাদারির ব্যবস্থ্য রয়েছে।

এরপর সূর্য উঠি করার আগেই দলে দলে লোক সেই মাছ এনে ফেলে কাঁটার। কাঁটা – মানে স্থানীয় আড়ত. এখানে ওজন হয়। দর দস্তুর কেনা-বেচা, হিসেব নিকেশ চলে। রুই, কাতলা, মৃগেল, পোনা থেকে তেলাপিয়া, নাইলোটিকা, সিলভার কার্প, পার্শে, চিংড়ি হয়েক মাছের হরেক দাম। সার সার ভ্যান সেই মাছ নিয়ে ছুটে চলে শহরের বাজারে। সেখানে মানুষ থলে হাতে দাঁড়িয়ে আছে টাটকা মাছ কিনবে বলে।

সূর্য উঠল আর এঁদের কাজও শেষ হল। তবে এটা হল একটা পর্যায়। জাল টেনে মাছ তোলার আগে আছে বেশ কটি পর্ব। অপূর্ব দক্ষতায় এসব কাজ সমাধ্য করেন স্থানীয় মানুষ। ভিম পোনা থেকে চারা পোনা করার জন্য আছে ছোট ছোট নার্সারী পুকুর। খেয়ে দেয়ে দৈর্ঘ্যে 2-3 ইঞ্চি হলে এদের তুলে পাশের বড় জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই জলাশয়গুলোর যথেষ্ট পরিমাণে মাছের খাদ্য জোগানের জন্য রয়েছে ময়লা জলের ক্যানালের সাথে এর যোগাযোগ। বাঁশ ও কাঠের লক গেট দিয়ে দরকার মত নোংরা জল ঢুকিয়ে নেওয়া হয় ভেড়িতে। অভিজ্ঞ লোকেরা জলের রঙ দেখে বলে দেন জলের গুণাগুণ। কোন জলে কোন মাছ চাষ হবে।

মাসের মধ্যে কম বেশী পনের দিন ফেলা হয়। বাকি পনের দিন অন্য কাজ. বছরে বার চারেক মাছের ডিম বা পোনা ছাড়া হয়। কতটা মাছ একেক বায়ে তোলা হবে তা ঠিক হয় প্রয়োজন ও বাজার বুঝে।

কয়েক বছর অন্তর ভেড়ির জল বার করে দেওয়া হয়। মাটি শুকোলে লাঙ্গল চালিয়ে মাটি আলগা করে মহুয়ার খোল আর চুন দিয়ে কদিন ফেলে রাখা হয়। পরে আবার জল ভরে নেওয়া হয়. অতিরিক্ত শ্যাওলা হলে এইভাবে পরিষ্কার করা হয় জলাশ। জলের রঙ দেখে এঁরা ঠিক করেন কখন ভেড়ি পরিষ্কার করতে হবে। জলে মাছের খাদ্য খুব বেশী হলেও সমস্যা। ওঁদের কাছে জানতে পারলাম-অনেক ছোট মাছ নাকি বেশী খেয়ে পেট ফেটে মরে যায়!

এখন কেমন চলছে


এক সময় এখানকার সব ভেড়িই ছিল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। বর্তমানে 4 নম্বর, সুকান্তনগর, নারকেলতলা ও চকের ভেড়ি-এই কয়েকটিতে মত্স্যজীবীরা সমবায় তৈরী করে চাষ করছেন। যদিও সরকারী রেজিস্ট্রেশন নম্বর মেলেনি এখনো। প্রায় প্রতিটি সমবায় ভেড়ির শ্রমিকের মাইনে মাসে 1010 থেকে 1050 টাকার মধ্যে। এছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিক কিছু পরিমাণ মাছ, বিড়ি-দেশলাই, শীতে কম্বল ও বর্ষার ছাতা পান বিনা পয়সায়। কোন কোন ভেড়িতে পূজোয় বোনাসও দেখায় হয়।

দৈহিক পরিশ্রমের কাজ, যেমন জাল টানা, ভেড়ি কাটা, বাঁধ দেওয়া এসব যাঁরা করেন তাঁদের দিনে 3/4 ঘণ্টা খাটতে হয়। আর হাল্কা কাজ, যেমন পানা পরিষ্কার, পাহারাদি এসব হলে দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টার মত। যে শ্রমিক আজ জাল টানলেন, কাল তাঁকে দেওয়া হয় পাহারা-দারির কাজ, এইভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাজ বণ্টন করা হয় যাতে কোন একজনের ওপর বেশী কাজের চাপ না পড়ে।

নারী শ্রমিকও আছেন অনেক। তবে তাঁদের জাল টানার মত ভারী কাজ দেওয়া হয় না-যদিও মাইনেকড়ি পুরুষ শ্রমিকের সমানই। তবে বেশীর ভাগ নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি তাঁরা কাজ পেয়েছেন তাঁদের মৃত স্বামী, বাবা বা ছেলের জায়গায়-সাধারণ ভেড়ি শ্রমিক যেভাবে কাজ পান, সেভাবে নয়। চার নম্বর ও সর্দার ভেড়িতে অবশ্য কিছু সরাসরি নিযুক্ত নারী শ্রমিকেও আছেন।

ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন ভেড়িগুলির চিত্র একটু ভিন্ন। সেখানে শ্রমিকদের মাস মাইনে 700-750 টাকার মত, আয় খাটুনি দিনে কমপক্ষে 8-9 ঘণ্টা।

খাসমহল


চকের ভেড়ি, সর্দার ভেড়ি আয় চিন্তা সিং ভেড়ির মাঝামাঝি জায়গায় খানিকটা উঁচু জমি রয়েছে। তারই নাম ‘খাসমহল’। এখানে আশপাশের অনেক ভেড়ি শ্রমিকের বসবাস। বেশীর ভাগই মুণ্ডা, রাজবংশী ও অন্যান্য দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। গ্রামের পথে হাঁটতে আশপাশে বাড়ী ঘর মানুষজন দেখলেই স্পষ্ট হয় নিদারুণ দারিদ্রের ছবি।

তাঁদের অনেকে এক সময়ে ছিলেন চিন্তা সিং ভেড়ির শ্রমিক। সরকার সেই ভেড়ি অধিগ্রহণ করে তারপর বাঁধ কেটে জল বের করে দিয়ে একে ঘাস জমি হিসাবে চিহ্নিত করে। শ্রমিকেরা অনেকে দেড় থেকে আড়াই বিঘের মত জমি পান। এখন সেখানে বছরে দুবার ধান চাষ হচ্ছে। তাতে সারা বছরের খোরাকি চলে না। বাকি সময়টা জনমজুরের কাজ করে কোনক্রমে দিন গুজরান করেন। আশেপাশে ভেড়িগুলির লাভজনক মাছ চাষ দেখে আজ উত্সাহী দু’এক জন ধান - জমিকে অগভীর পুকুরে পরিণত করে মাছ চাষের চেষ্টা করছেন।

আজকের সঙ্কট


ভেড়ি অঞ্চলের মানুষজনের আজ সত্যিই দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে। সল্টলেক উপনগরী পত্তনের সময়ে একবার এঁরা জীবিকা ও বাসস্থান হারিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলেন। আবার একই আশঙ্কার মুখোমুখি। জানিনা কি এঁদের ভবিষ্যত। খাসমহলের বাসিন্দা মাঝবয়েসী একজন ভেড়ি শ্রমিক স্বপ্না মাণ্ডকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-‘কি করবেন এবার?’ জানালেন-‘যখন উচ্ছেদ করতে আসবে তখন দেখা যাবে।’ একটু থেমে যোগ করলেন-‘মুণ্ডা কখনো লড়াই ছাড়া জমি ছাড়ে না।’

Disqus Comment