স্ট্যাণ্ডার্ড ফার্মাসিউটিক্যালস

Submitted by Hindi on Mon, 07/03/2017 - 12:34
Source
দ্বি-মাসিক পত্রিকা, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী – (মে – জুন সংখ্যা) ১৯৯১।

20 জানুযারী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুই অফিসার গিয়েছিলেন আহমেদাবাদ। এস – পি - ওপেকের ভবিষ্যত নিয়ে সারাভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা বলতে। শিল্পপতি গৌতম সারাভাইয়ের সাথে তাঁদের কথা হয়েছে। এবং এর মারফতই জানা গেছে এস পি -ওপেক খোলার ব্যপারে সারাভাইদের অ্যাকশন প্ল্যানের কথা। হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে চড়ে শ্রীরামপুর স্টেশনে ঢোকার মুখে পড়বে সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পের আলোর উজ্জ্বল এক ফ্লাই-ওভার (উড়াল পুল)। আর ঠিক তার আগেই বাঁদিকে তাকালে দেখবেন ধোঁয়া জড়িয়ে থাকা রাতের অন্ধকারে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্ট্যাণ্ডার্ড ফার্মাসিউটিক্যালস। তার দরজার তালা আজও বন্ধ। 30 মে যে শ্রমিকরা মালিকদের অন্যায়ভাবে কারখানায় তালা লাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘ আট মাসের ভয়ঙ্কর কালো অভিজ্ঞতা তাঁদের ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। পাঁচ বছরে পনের কোটি টাকা (1982-1987) সরালো যারা, সেই মালিক সারাভাইদের কোন শান্তি আজও হয় নি। পাশাপাশি তিনটে প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়ন আর ‘বাঁচাও কমিটি’ -তে ভাগ হয়ে থাকা শ্রমিকদের এক জায়গায় জড়ো হওয়া বোধহয় খুবই কঠিন কাজ।

‘বাঁচাও কমিটি’ লড়ছে


না, খুব বেশী শ্রমিক কমিটিতে নেই। আর থাকবেনই বা কি করে? ঝাণ্ডা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে পেট তো মানবে না। এদিক-ওদিক কিছু রোজগারের চেষ্টা তো করতেই হবে। তবু ‘বাঁচাও কমিটি’ চেষ্টা করছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সভা করছে। বন্ধুদের সাহায্যে কূপন বিক্রি করে টাকা তুলছে। চেষ্টা করছে প্রভিডেণ্ট ফাণ্ডের টাকা যাতে সবাই তুলতে পারে। 29 অক্টোবর এই উদ্দেশ্য তারা এক লিফলেটও প্রকাশ করে। ওই একই দিনে প্রকাশিত অন্য এক লিফলেটে বাঁচাও কমিটি শ্রমিক-সমবায় গড়ার দাবীও তুলে ধরে।

বি আই এফ আর কি করছে ?


1 আগষ্ট 91 বি আই এফ আর রাজ্য সরকারকে তিন মাস সময় দিয়েছিল ওপেককে চাঙ্গা করে তোলার পথ ঠিক করার জন্য। 28 অক্টোবর ওই সময়সীমা পার হয়ে গেল। অথচ রাজ্য সরকার কিছুই ঠিক করতে পারল না। এই অবস্থায় গত 15 নভেম্বর বি আই এফ আর ওপেক ইনোভেশনস লিমিটেডকে তুলে দেবার কথা বলতে শুরু করেছে। ঠিক হয়েছে 10 ফেব্রুয়ারী 1992 এ ব্যাপারে বি আই এফ আরের সামনে কথাবার্তা হবে। আর এই অবস্থাতেই বাঁচাও কমিটি, বিভিন্ন গণ বিজ্ঞান, নাগরিক অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো একযোগে অভিযোগ জানালেন এম আর টি পি কমিশনের সামনে।

এম আর টি পি কমিশন


মনোপলি এ্যাণ্ড রেষ্ট্রিকটিভ ট্রেড প্র্যাকটিসেস কমিশনের ক্ষমতা আছে বছরে 20 কোটি টাকার বেশী ব্যবসা করে এমন সংস্থাগুলোর ওপরে খবরদারি করার। এম আর টি পি আইনের সংশোধিত ধারাগুলোর জোরে কমিশন দু দিক থেকে কোম্পানীদের অপরাধ ধরতে পারে। একটা কোম্পানী ভেঙে দুটো করলে তা কমিশনের অনুমতি নিয়ে করতে হয়। স্পষ্টতঃই সারাভাইরা এখানে আইন ভাঙার দায়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি যারা পেনিসিলিন ট্যাবলেট কিনবে তাদের স্বার্থের দিক থেকেও মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা যায়। এই দুই কারণেই আম্বালাল সারাভাই এণ্টারপ্রাইজেস লিমিটেড, সিনবায়োটিক্স লিমিটেড ও ওপরে ইনোভেনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে 7 জানুযায়ী 1992 তারিখে। আর পরের দিন অর্থাত 8 তারিখ বি আই এফ আর -কে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এই অভিযোগ পত্রের কপি। আবেদন করা হয়েছে এক্ষুণি এক্ষুণি ওপেক গুটিয়ে নেবার চেষ্টা বন্ধ করতে - যেহেতু বিষয়টি এখন এম আর টি পি কমিশনের সামনে রয়েছে।

দাবী উঠেছে-সারাভাইদের চুরি ধর


13 জানুযায়ী মাদ্রাজে সারাভাই গ্রুপের মেডিক্যাল রিপ্রেজেণ্টিটিভরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য। এই সভা ডাকা হয়েছিল ফেডারেশন অফ মেডিক্যাল এ্যাণ্ড সেলস রিপ্রেজেণ্টেটিভস অ্যাসেসিয়েশনস অফ ইণ্ডিয়া (এফ এম আর এ আই) -র তরফ থেকে। নানান অঞ্চল থেকে আসা ফিল্ড ওয়ার্কররা (যাঁদের মধ্যে সরাসরি স্ট্যাণ্ডার্ড ফার্মাসিউটিক্যালস -এর লোকেরাও আছেন) জোরাল দাবী তোলেন যে 28 ফেব্রুয়ারীর মধ্যে তাঁদের পাওনা টাকা পয়সা মিটিয়ে দিতে হবে নয়ত 2 মার্চ থেকে তাঁরা আন্দোলনের পথে যাবেন। এটা খুবই ন্যায্য দাবী। কিন্তু এই দাবীতেই তাঁরা নিজেদের আটকে রাখেন নি। সভার প্রধান দাবী হল -সারাভাই তাঁরা নিজেদের আটকে রাখেন নি। সভার প্রধান দাবী হল- সারাভাই গোষ্ঠি যেভাবে টাকা তছরূপ করে, আইন ভেঙে এস পি ওপেক বন্ধ করে দিয়েছে তার খোলাখুলি তদন্ত হোক। এই উদ্দেশ্যে ওই দিনই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লেখা হয়েছে এবং চিঠির কপি অন্যান্য মন্ত্রীদেরও দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি সভার বক্তব্য পাঠিয়ে দেওয়া ম্যানেজমেণ্টকেও সরাভাইরা কি বলেছে?

20 জানুযারী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুই অফিসার গিয়েছিলেন আহমেদাবাদ। এস – পি - ওপেকের ভবিষ্যত নিয়ে সারাভাইয়ের সাথে সরাসরি কথা বলতে। শিল্পপতি গৌতম সারাভাইয়ের সাথে তাঁদের কথা হয়েছে। এবং এর মারফতই জানা গেছে এস পি -ওপেক খোলার ব্যপারে সারাভাইদের অ্যাকশন প্ল্যানের কথা।

এস পি
এস পি তে অফিসার - শ্রমিক মিলিয়ে কর্মী সংখ্যা 409 জন। তাঁদের মধ্যে 148 জনকে ছাঁঠাই করা হবে। হিসেবটা এই রকম –

শ্রমিক সংখ্যা

অফিসার সংখ্যা

এখন                    

379     

30

ছাঁটাই হবে     

142     

6

থাকবে             

237     

24

 

ওপেক
ওপেকে অফিসার-শ্রমিক মিলিয়ে কর্মী সংখ্যা 919 জন তাঁদের মধ্যে 719 জনকে ছাঁটাই করা হবে। হিসেবটা এই রকম—

শ্রমিক সংখ্যা

অফিসার সংখ্যা

এখন  

810

109

ছাঁটাই হবে

644

75

থাকবে 

166

34

 

এস পি এবং ওপেক উভয় জায়গাতেই উত্পাদন শুরুর খরচা সারাভাইরা দেবে। কিন্তু কর্মীদের বেতন বা অন্যান্য বকেয়া পাওনার ব্যবস্থা করতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। পাশাপাশি বিদ্যুতের বিল, বকেয়া কর, এ সবের জন্য আপাতত ছাড় দিতে হবে। এক্ষুনি বিদ্যুত সরবরাহ চালু করতে হবে। লেভির দরে কারখানাকে চিনি সরবরাহ করতে হবে, ইত্যাদি।

সারাভাইরা চায় এই পরিকল্পনাটিই পশ্চিমবঙ্গ সরকার বি আই এফ আর এর সামনে করুক।

ওপেকের ডাইরেকটার ও পি খান্নার সই করা এই খসড়া (পরিবর্তিত) প্রস্তাবটি সারাভাইরা 1 ফেব্রুয়ারী কলকাতায় এস পি -ওপেকের স্বীকৃত চারটি ট্রেক ইউনিয়নকে দিয়েছে বিবেচনার উদ্দেশ্যে।

অবস্থাটা কি দাঁড়াচ্ছে


জনস্বাস্থ্য ও জনবিজ্ঞান উদ্যোগগুলির পক্ষ থেকে দাবী ছিল যে অবিলম্বে সাধারণ মানুষের স্বার্থে শ্রীরামপুরে পেনিসিলিন উত্পাদন শুরু হোক। কিন্তু এ প্রশ্ন উঠবেই যে এর জন্য কি দাম কর্মীরা দেবে? 919 জনের মধ্যে 719 জন ছাঁটাই! নিষ্ঠুরতার তো একটা সীমা আছে। সারাভাইদের প্রস্তাবটা ভাল করে দেখুন। সেই পুরোন কায়দা। –উত্পাদনের খরচা আমরা দেব। সরকার ব্যাঙ্কের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করে কর্মীদের বেতন মেটাক। করে ছাড় দিক। এখনই ইলেকট্রিকের বিল যেন না দিতে হয়। আর এসব না মানলে আমরা কারখানা বেচে দিতে রাজী আছি। তবে যোগ্য দাম পেলেই। অর্থাত সারাভাইরা এখান থেকে আরও টাকা বের করে নিয়ে যেতে চায়। তাই 5 ফেব্রুয়ারী রাজ্যের বাণিজ্য মন্ত্রীর কাছে স্পষ্টভাবেই যৌথ আন্দোলনের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে যে এস পি আর ওপেককে এক করে হয় সরকারী তত্ত্বাবধানে চালানো হোক, নয়ত শ্রমিক সমবায় গড়ে সংযুক্ত কারখানাকে তাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হোক। সারাভাইদের এস পি- ওপেক থেকে হঠাতেই হবে।

কিন্তু দাবী যাইই উঠুক তার পিছনে ইউনিয়নের গণ্ডী ছাপিয়ে সব শ্রমিকের একজোট হয়ে দাঁড়ানো খুব জরুরী।

এমনিতেই তো পেটের জালা মেটাতে ডালা নিয়ে রাস্তার বসা শ্রমিকরা কারখানা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। আর এই মানুষরাই যদি না নিজেদের স্বার্থে নিজেরা উঠে দাঁড়াতে পারেন তবে বাঁচাও কমিটি হোক কি প্রতিষ্ঠিত অন্য কোন ইউনিয়নই হোক - কেউই সম্পূর্ণ পরাজয়ের হাত এড়াতে পারবে না।

Disqus Comment